ঢাকা থেকে মীর আফরোজ জামান
ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে চিকিৎসা সেরে ঢাকায় ফিরে ঐতিহ্য বহনকারী পিআরসি'র অভিজ্ঞতার কথা লিখলেন সাংবাদিক মীর আফরোজ জামান। তিনি ব্যাখ্যা দিলেন কেন পশ্চিমবঙ্গে কম খরচে প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসার আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠছে কলকাতার পার্ক সার্কাসের ২৬/সি দিলখুশা স্ট্রিটে অবস্থিত পিপলস রিলিফ কমিটি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত প্রান্তিক পরিবার আজও মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। সরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা এবং বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। এই বাস্তবতায় কলকাতার দিলখুশা স্ট্রিটে অবস্থিত পিপলস রিলিফ কমিটি (পিআরসি) দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে হাজারো মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঐতিহ্য বহনকারী পিআরসি শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জনস্বাস্থ্যভিত্তিক একটি সামাজিক আন্দোলনের অংশ। স্বাধীনতার আগে দুর্ভিক্ষ, বন্যা ও মানবিক সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, ত্রাণ, পুনর্বাসন ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করেছে।
আজ কলকাতার পার্ক সার্কাসের ২৬/সি দিলখুশা স্ট্রিটে অবস্থিত কেন্দ্রটি প্রতিদিন শত শত রোগীকে স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে। চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের বড় অংশই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবীণ নাগরিক এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, যাদের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা গ্রহণ করা কঠিন।
স্বল্প ব্যয়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা পিআরসি'র -এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে বহির্বিভাগ (ওপিডি) পরিচালিত হয়। সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি হৃদরোগ, শিশু, চক্ষু, অর্থোপেডিক, স্ত্রী ও প্রসূতি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
এছাড়া প্যাথলজি, এক্স-রে, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, ডায়ালাইসিস এবং বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা তুলমূলক কম খরচে করার সুযোগ রয়েছে। ব্যয়বহুল পরীক্ষার ক্ষেত্রেও রোগীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে, যাতে অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ না হয়ে যায়। পিআরসি'র অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—চিকিৎসাসেবাকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পরিচালনা করা।
কলকাতার বাইরে বিস্তৃতি দিলখুশা স্ট্রিটের প্রধান কেন্দ্র ছাড়াও হাওড়া, উত্তরপাড়া, বাঘাযতীন, হালিশহর, উদয়নারায়ণপুর এবং বহরমপুরে পিআরসি'র স্বাস্থ্যসেবার কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে শহরের বাইরেও সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নেতৃত্ব ও মানবিক উদ্যোগ পিআরসি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে আসছেন। পিআরসি’র ধারণ সম্পাদক ডাঃ ফুয়াদ হালিম, যিনি বহু বছর ধরে সংগঠনের স্বাস্থ্যসেবা কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর পাশাপাশি অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিদিন রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সংকটের সময় মানুষের পাশে কোভিডের সময় নতুন করে আলোচনায় আসে। লকডাউন চলাকালে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ, চিকিৎসা পরামর্শ এবং জরুরি মানবিক সহায়তার মাধ্যমে হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়ায় সংগঠনটি। দুর্যোগ ও সংকটের সময়ও তাদের এই মানবিক ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পিআরসি? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় কমাতে এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পিআরসি'র মতো অলাভজনক উদ্যোগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে,পিআরসি’র কাজ আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে- প্রতিটি জেলায় স্বল্প ব্যয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচি সম্প্রসারণ। ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড ও আধুনিক ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি। স্বাস্থ্যবিমা ও সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্য তহবিল গঠনে উদ্যোগ। নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবির, রক্তদান কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কাজ জোরদার করা। উন্নয়নের এক বিকল্প মডেল পশ্চিমবঙ্গে যখন স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে, তখন পিআরসি দেখিয়ে দিয়েছে যে সামাজিক উদ্যোগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে স্বল্প ব্যয়েও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সম্ভব।
দিলখুশা স্ট্রিটের এই প্রতিষ্ঠান আজ শুধু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়; এটি বহু মানুষের কাছে আশার প্রতীক। অর্থের অভাবে যাতে কোনো রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন—এই লক্ষ্য নিয়েই তাদের পথচলা। স্বাস্থ্যসেবা যখন ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তখন পিআরসি'র অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে জনমুখী, অলাভজনক এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও কার্যকর হতে পারে। প্রান্তিক মানুষের জন্য চিকিৎসার দুয়ার উন্মুক্ত রাখার এই উদ্যোগ আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশা স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের।
People's Relief Committee
বহু মানুষের আশার প্রতীক পিআরসি
×
Comments :0