Ram Mandir Theft

রামের ঘরে চুরি!

জাতীয় স্পটলাইট

কেউ ছিল গাড়ির মেকানিক, কেউ আবার অটো চালাতেন। ‘আত্মনির্ভর’ ভারতে আজ তাঁরা কোটিপতি। শুধু অযোধ্যা শহরেই বাড়ি-গাড়ি নয়, দেহাতে তাঁদের দারুণ ফার্ম হাউসও গজিয়ে উঠেছে। কারোর ভাইপোর কাছ থেকে মিলছে ৩৬ লক্ষ টাকা, কারও বাড়ির গোবরের মধ্য হাতড়ালে মিলছে দশ লক্ষ টাকা। রামশঙ্কর থেকে লবকুশ মন্দির-কর্মীদের অনেকেই এখন ফেঁসে গিয়েছেন অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া দানের টাকা গিলে খেয়ে।
‘সিট’ গড়েছে উত্তর প্রদেশ সরকার। তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে অভিযুক্ত এমন কর্মীরা। অথচ যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাদের এই চাকরি, শ্রী রাম মন্দির তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই। গত ৬ জুলাই ট্রাস্টের বৈঠকেও আরএসএস’র প্রচারক এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা চম্পত রায়কে ক্লিন চিট দেওয়া হয়েছে। জল যদিও আরও খানিক দূর গড়াতে পারে। কারণ আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্তের একাধি আবেদনে শুনানির দিন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। 
কীভাবে সামনে এল অভিযোগ?
----------------------
রামলালার গর্ভগৃহ ও দর্শনপথের কাছে থাকা দানবাক্সগুলির অর্থসংগ্রহ করে মন্দির চত্বরে অবস্থিত একটি গোপন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নোট গণনার কাজ চলত।
এই কাজে যুক্ত ছিলেন মোট ৫০ জন কর্মী। তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের দায়িত্ব ছিল নোট গোনা ও বান্ডিল তৈরির। ১২ জন ট্রাস্টের কর্মী, গোটা ব্যাপারটা  তদারকি করতেন। বাকি ১৪ জন স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) ও টিসিএসের অডিট টিমের সদস্য। 
অভিযোগ, এই কর্মীদের মধ্যে কয়েকজন গত পাঁচ বছরে হঠাৎ বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। দামি গাড়ি, জমি, বাড়ি কেনার ঘটনা নজরে আসে। এরপরই সন্দেহ ঘনীভূত হতে শুরু করে।
তদন্তের কেন্দ্রে কারা?
----------------
রামশঙ্কর ওরফে টিন্নু যাদব: চম্পত রায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি
ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে পরিচিত টিন্নু যাদবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। একসময় অটোচালক ছিলেন তিনি। নিজেও মোটরসাইকেলে চলাফেরা করতেন। রামমন্দির থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের স্বর্গোদ্বার এলাকায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি রয়েছে, সেখানে এখন তাঁর ভাইরা থাকেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বিমানবন্দরের কাছে টিন্নুর একটি ৭০ কক্ষবিশিষ্ট হস্টেলও রয়েছে।
এ ছাড়া অযোধ্যার তিনটি পৃথক রেস্তোরাঁয় তাঁর অংশীদারির কথা জানা গিয়েছে। লক্ষ্ণৌয়ে একটি বাড়ি ও একটি ফর্চুনার গাড়িও রয়েছে বলে দাবি। অযোধ্যা ও লক্ষ্ণৌ মিলিয়ে মোটামুটি তাঁর প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি।
মণীশ যাদব: টিন্নু যাদবের ভাইপোর কাছ থেকে উদ্ধার ৩৬ লক্ষ টাকা নগদ
টিন্নুর ভাইপো মণীশ যাদবও নোট গণনার দলের সদস্য ছিলেন। অভিযোগ, শ্রীরাম জন্মভূমি চত্বরে নিজের প্রভাব খাটিয়ে টিন্নু যাদব তাঁর ভাইপো মণীশ যাদবের চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। মণীশও মন্দিরের প্রণামীর টাকা গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি স্বর্গোদ্বার এলাকায় টিনুর পৈতৃক বাড়িতেই থাকেন।
তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত একটি স্থান থেকে প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়েছে।
কেডি তিওয়ারি: ভক্তদের দান করা সোনার গয়না সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন। এখন তদন্তের আওতায়।
রামমন্দিরে ভক্তদের দান করা সোনা-রুপোর গয়না গ্রহণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন কে ডি তিওয়ারি। তদন্তে তাঁর নামও সন্দেহভাজনদের তালিকায় উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে তাঁর কেনা প্রায় ১.৫ কোটি টাকার জমি। অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছরে তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
রাজেশ পাঠক: অযোধ্যার খালে পুরওয়া এলাকার বাসিন্দা রাজেশ পাঠকও তদন্তকারীদের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। তিনি মন্দিরের প্রণামী বাক্স থেকে পাওয়া নগদ টাকা গোনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একজন। এখন তাঁকেও মন্দির চত্বরের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে রাখা হয়েছে এবং ট্রাস্টের তদন্তকারী প্রতিনিধিরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
অনুকল্প মিশ্র: গ্রামে ফার্ম হাউস, অযোধ্যায় ৬৫ লক্ষ টাকার বাড়ি। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে লবকুশ নামে এক কর্মীর নাম। তাঁর শ্যালক অনুকল্প মিশ্রও নগদ টাকা গোনার দায়িত্বে ছিলেন। সূত্রের দাবি, অযোধ্যার কৌশলপুরী এলাকায় মানস ডেন্টাল হাসপাতালের কাছে একটি বাড়ি রয়েছে, যা আগে এক ভোজপুরি গায়কের মালিকানাধীন ছিল। পরে অনুকল্প মিশ্রের পরিবার সেটি প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ লক্ষ টাকায় কিনে নেয়। 
লবকুশ: একসময় গাড়ির মেকানিক, এখন গোবরের মধ্যে টাকা রাখেন!
লবকুশ একসময় গাড়ির মেকানিক হিসাবে কাজ করতেন। অযোধ্যার রুদৌলি এলাকার মীনাপুর ঠাকুরান ফগৌলি গ্রামের বাসিন্দা। অভিযোগ, রামমন্দিরে চাকরি পাওয়ার পর তাঁর আর্থিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে। গ্রামে গেলে লবকুশ খুল্লাম খুল্লা টাকা ওড়াতেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় সূত্রের মতে, একবার গ্রামের লোকজনকে মদ খাওয়াতে তিনি প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। লবকুশের বাবা বচ্চুলাল গাজিয়াবাদের লোহা বাজারে কাজ করেন।

‘দানচোরি’
-------
প্রণামিতে দেওয়া বহুমূল্য দান সামগ্রী লোপাট হয়েছে। যেমন চুরি গিয়েছে রামের পাদুকা। রামমন্দিরে দান করা রুপোর হার, চরণপাদুকা এমনকি ইটও ‘উধাও’ হয়ে গিয়েছে। অভিযোগ, রামলালাকে দেওয়া প্রায় ৩ কেজি ওজনের রুপোর হার আর ১ কেজি ওজনের রুপোর চরণ পাদুকা গলিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তার কোনও নথি বা প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 
৩ কেজির রুপোর হার কোথায়?
মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী অনিল বিশ্বকর্মা এবং তাঁর পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা রামলালার উদ্দেশ্যে প্রায় ৩ কেজি ওজনের রুপোর হার এবং ১ কেজি ওজনের রুপোর চরণ পাদুকা দান করেছিলেন।
পরিবারের দাবি, প্রায় ২০০ কিলোমিটার খালি পায়ে হেঁটে অযোধ্যায় পৌঁছে তাঁরা এই সামগ্রী ট্রাস্ট-ঘনিষ্ঠ টিনু যাদবের হাতে তুলে দেন। অলঙ্কারগুলি গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে তার কোনও রসিদ বা সরকারি নথি দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ, পরে তাঁদের জানানো হয় যে ওই রুপোর সামগ্রী গলিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তার কোনও নথি বা প্রমাণ দেখানো হয়নি।
হদিশ নেই ৬০ কেজি রুপোর
আরও গুরুতর অভিযোগ করেছে ইন্ডিয়ান বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের উত্তর ভারতের প্রধান অনুরাগ রাস্তোগীর দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৬০ কেজি রুপো গলিয়ে তৈরি করা রুপোর ইট ট্রাস্টের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
এই রুপোর ইটগুলিতে দাতাদের নাম ও গোত্র খোদাই করা ছিল। এছাড়াও রুপোর কলসি, প্রদীপ, বাটি, পঞ্চধাতুর সামগ্রীও দান করা হয়েছিল।
অভিযোগ, বর্তমানে এই সামগ্রীর কোনও সরকারি নথি বা অবস্থান জানা যাচ্ছে না।
ফের চুপ প্রধানমন্ত্রী
--------------- 
২০২০’র ফেব্রুয়ারিতে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠনের আদেশনামা জারি করেছিল কেন্দ্রের সরকার। সংসদে এই ট্রাস্টের নাম ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে। রামমন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠায় সাধু সন্তদের সরিয়ে পুরোহিতের ভূমিকায় আসীন ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কর্পোরেট-হিন্দুত্বের জাঁকালো আয়োজনের সব কিছুরই কেন্দ্রে থেকেছেন তিনি নিজে। ভোটের প্রচারের সাফল্যের দাবিতে যা যা বলেছেন তার অন্যতম এই রামমন্দির। দানসামগ্রী চুরির ঘটনায় তিনিই বিলকুল চুপ। সারা দেশকে নজরদারিতে রাখতে ব্যস্ত তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা। আর রামমন্দিরে দিনের পর দিন সামগ্রী সরানোর কর্মকাণ্ড নজরে এল না কেন, তা নিয়েই রয়েছে জোরালো প্রশ্ন।
রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহু ঘোষিত ‘রামায়ণ সার্কিট’ গড়ার সময়েও নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তা উল্লেখ করা হয়েছিল কম্পট্রোলার অব অডিটর জেনারেল(ক্যাগ)-এর রিপোর্টেও। সিএজি প্রশ্ন তুলেছিল মূলত ‘রামায়ন সার্কিট’-র দ্বিতীয় পর্বের কাজ নিয়ে। যে কাজ ছিল প্রধানত অযোধ্যা কেন্দ্রিক। কাজে ধরা পড়েছিল অনেক অসঙ্গতি। 
যেমন, অযোধ্যাকে কেন্দ্র করে এই প্রকল্পের কোনও ‘ফিসিবিলিটি সার্ভে’-র হদিশ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ যা একটি প্রকল্পের পরিকল্পনার প্রাথমিক কাজ, তাই হয়নি। কোনও ট্রাস্টের থেকে জমি নেওয়া যাবে না, এই ছিল শর্ত। কিন্তু সেই শর্তও মানা হয়নি। দীগম্বর আখড়া ট্রাস্ট থেকে ৩কোটি ৬লক্ষ টাকা দিয়ে জমি নেওয়া হয়েছে। 
জমির কোনও বন্দোবস্ত না করে পাটেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নের কাজ শুরু হয়ে যায়। পরে তা বন্ধ তা করতে হয়। তার জন্য টাকা নষ্ট হয়। এই প্রকল্পে ঠিকাদারদের অন্যায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে গুপ্তার ঘাটের উন্নয়নের কাজে। গুপ্তার ঘাটের উন্নয়নের কাজকে ১৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। আলাদা আলাদা ঠিকাদরাদের বরাত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই কাজের জন্য ঠিকাদারদের আলাদা আলাদা রেটে বরাত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই প্রকল্পে ঠিকাদরাদের সুবিধা মতো কাজ করিয়েছে রাজ্য সরকার। এতে প্রায় ২০লক্ষ টাকা বাড়তি পেয়েছে ঠিকাদার। তারপরেও আছে। ৫% বিভাগীয় ডিসকাউন্ট দেওয়ার শর্ত ছিল। যোগী আদিত্যনাথের সরকার সেই শর্ত মানেনি। ফলে প্রায় ৩কোটি ৮৬লক্ষ টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। ঠিকমত পরিকল্পনা না করার কারণে জিএসটি, লেবার সেস সহ নানা ক্ষেত্রে এই প্রকল্পে আরও ৬ কোটি ৭লক্ষ টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। শর্ত ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা ব্যাঙ্কে রাখার কারণে যে সুদ জমবে তা কেন্দ্রীয় সরকারকে ফেরত দিতে হবে। দেখা যায়, সেই সুদ উত্তর প্রদেশ স্টেট ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড এবং উত্তর প্রদেশ রাজকীয় নির্মাণ নিগম ফেরত দেয়নি। তার পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ২৮লক্ষ টাকা।
 

Comments :0

Login to leave a comment