NATUNPATA | STORY | BISCUIT | SOURISH MISHRA | 26 SEPTEMBER 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | গল্প | বিস্কুট | সৌরীশ মিশ্র | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  STORY  BISCUIT  SOURISH MISHRA  26 SEPTEMBER 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

গল্প 

বিস্কুট

সৌরীশ মিশ্র 

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 


প্রসেনজিতবাবুর মোটরবাইকটা "অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার" নামের মুদি দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াতেই ঐ দোকানের মালিক অলকবাবু দোকানের কর্মচারী চিন্টুকে বললেন, "যা, দাদাকে এগুলো দিয়ে আয়।" বলে চারটে ছোটো বিস্কুটের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন চিন্টুর দিকে। তারপর প্রসেনজিতবাবুর দিকে তাকিয়ে হাসি-হাসি মুখে বললেন, "আপনাকে আর নামতে হবে না বাইক থেকে। ওই দিয়ে দিচ্ছে। আপনি তো আসবেন জানতাম। তাই বের করেই রেখে ছিলাম আগে থেকে।"
"থ্যাংক ইউ।" ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বললেন প্রসেনজিতবাবু।
ততক্ষণে চিন্টু এসে দাঁড়িয়েছে প্রসেনজিতবাবুর সামনে। প্রসেনজিতবাবু শার্টের বুক-পকেট থেকে দুটো নোট বের করে দামটা দিয়ে দিলেন আগে চিন্টুকে। তারপর, চিন্টুর হাত থেকে বিস্কুটের প্যাকেট চারটে নিয়ে অফিস ব্যাগটায় ঢোকালেন। তারপর অলকবাবুর দিকে তাকিয়ে ডানহাতটা তুলে বললেন, "আসলাম।"
মুদি দোকানি অলক বণিক-ও সাথে-সাথে বলে উঠলেন, "আসুন।"
প্রসেনজিতবাবু বাইক স্টার্ট করলেন। তারপর একটু এগিয়ে ডানদিকে ঘুরে ওনাদের বাড়ির গলিটা ধরলেন।

এখন প্রায় রাত ন'টা বাজতে যায়। অফিস থেকে ফিরছেন প্রসেনজিতবাবু। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে বেশিরভাগ দিনই বেশ দেরী হয়ে যায় তাঁর। দশটা-সাড়ে দশটাও কোনো ব্যাপারই না। সেই তুলনায় আজ বেশ তাড়াতাড়িই বেরোতে পেরেছেন তিনি অফিস থেকে। তবে, যত দেরীই হোক না কেন, অফিস ফেরতা পাড়ার মুখে পড়া এই দোকানটা থেকে বিস্কুট কেনা তাঁর ডেইলি রুটিনের মধ্যেই পড়ে। ওরা যে অপেক্ষা করে থাকে প্রতিদিন প্রসেনজিতবাবুর ফেরার এই সময়টায়।

প্রসেনজিতবাবুর বাইকটা তাঁর বাড়ির গলিটায় ঢুকতেই ওদের দেখতে পেলেন প্রসেনজিতবাবু। আর ওরাও ছুটে এলো প্রসেনজিতবাবুর বাইকটা গলিতে ঢোকা মাত্রই। তারপর চলতে থাকল প্রসেনজিতবাবুর বাইকের পাশে-পাশে। প্রসেনজিতবাবু বাইক স্লো করলেন প্রথমে। তারপর গলির একপাশে সাইড করে দাঁড় করালেন সেটাকে। ওদেরকে দেখা মাত্রই মনটাই ভালো হয়ে গেল প্রসেনজিতবাবুর। প্রসেনজিতবাবু পশু-প্রেমী। এই পাড়ার যে কুকুরগুলো আছে, যারা একটু আগে প্রসেনজিতবাবুর বাইকের সাথে-সাথে এল আর এই মুহূর্তে ঘিরে ধরেছে ওনাকে, তাঁদেরকে খাওয়ান তিনি দু'বেলা নিয়ম করে। এই যে অলকবাবুর দোকান থেকে কিছুক্ষণ আগে বিস্কুট কিনলেন না তিনি, তাও ওদের জন্যই।

প্রসেনজিতবাবুর বাইকটির চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখন লালু, সাদু আর ভুলো।
প্রসেনজিতবাবু প্রথমে সবকটার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন একটু। তারপর ব্যাগ থেকে বের করলেন বিস্কুটের প্যাকেটগুলো। সেগুলো তারপর একের পর এক খুলে, দিতে শুরু করেন ওদের। লালু, সাদু আর ভুলো-ও খেতে থাকে আনন্দ করে। প্রত্যেকের জন্য একটা করে প্যাকেট বরাদ্দ। তিনটে প্যাকেট দেওয়া হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। আর একটা প্যাকেট খুলতে যাবেন তখনই মনে পড়ে গেল প্রসেনজিতবাবুর ফের কালুর কথা।

আজ সারাদিনই কালুর কথা মনে পড়েছে প্রসেনজিতবাবুর। এই পাড়ার সবচাইতে ছটপটে কুকুর ছিল ওই। প্রসেনজিতবাবুর ন্যাওটাও ছিল সবচাইতে বেশি। বাকি তিনটে কুকুর গলির এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও প্রসেনজিতবাবুদের বাড়ির সামনে থেকে নড়তো না কালু কক্ষনো। আর, প্রসেনজিতবাবুকে দেখলে তো আর কথাই ছিল না। দু'পায়ে দাঁড়িয়ে পড়তো সোজা প্রসেনজিতবাবুর গা ধরেই। প্রসেনজিতবাবুর আদর খেয়ে তবে তার শান্তি।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁর একতলা বাড়ির ছোট্ট বারান্দাটায় এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ান প্রসেনজিতবাবু। এটাই তাঁর অভ্যাস। কাল বারান্দায় এসে প্রসেনজিতবাবু দেখেন অন্যান্য দিনের মতোনই কালু আজও শুয়ে বাড়ির ঠিক সামনের সরু প্যাসেজটাতেই। কিন্তু, এই ভাবে শুয়ে কেন কালু! প্রশ্নটা কালুর শোওয়ার ভঙ্গি দেখেই কেন জানি উঁকি মারে তাঁর মনে। ভিতর থেকে তাঁর, কেমন একটা কু-ডাক যেন ডাকে। তিনি তাড়াতাড়ি বারান্দার গ্রিলের গেটটার চাবি এনে গেটটা খুলে বাইরে আসেন। ডাকেন, "কালু... কালু..." কণ্ঠস্বর তাঁর উৎকণ্ঠায় ভরা।
অন্যান্য দিন তো ডাকতেও হয় না, প্রসেনজিতবাবু বারান্দায় এসেছেন দেখলেই ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙ্গে গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় কালু। কিন্তু, কাল তেমন কিছুই হয়নি। 
প্রসেনজিতবাবু নিজেকে সামলাতে না পেরে প্যাসেজেই বসে পড়েছিলেন কালুর পাশটায়। কালুর গায়ে হাত দেওয়ার আগে আর একবার ডেকেছিলেন, "কালু, অ্যাই কালু?" 
না, সাড়া দেয়নি কালু। তখন গায়ে হাত দিয়েছিলেন কালুর, প্রসেনজিতবাবু। একটা আশঙ্কায় হাতটা কাঁপছিল তাঁর। তবে কালুর শরীরে হাত রাখতেই যা বোঝার বুঝে গিয়েছিলেন তিনি। বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁর কালু আর তাঁর হাজার ডাকাতেও সাড়া দেবে না কোনোদিন। প্রসেনজিতবাবু সস্নেহে তাঁর কোলে তুলে নিয়েছিলেন কালুর মাথাটা। তাঁর দু'চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিল কালুর নিথর দেহে।

গাড়ির হর্নের শব্দে বর্তমানে ফিরলেন প্রসেনজিতবাবু। পিছনে তাকিয়ে দেখলেন তিনি, একটা গাড়ি ঢুকেছে গলিটায় বড়রাস্তা থেকে। লালু, সাদু আর ভুলো প্রসেনজিতবাবুকে ঘিরে গলিতে দাঁড়িয়ে। ওদের যাতে না লাগে গাড়িতে ধাক্কা, তাই ওদের রাস্তা থেকে সড়াতে গাড়ির ড্রাইভার হর্ন দিয়েছে। 
প্রসেনজিতবাবু সেটা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন ওদের, "অ্যাই, সড়ে যা, সড়ে যা।"
লালু, সাদু আর ভুলো-ও রাস্তা ছেড়ে দেয়। গাড়িটা বেড়িয়ে যায় ওদেরকে কাটিয়ে।
প্রসেনজিতবাবুর এবার খেয়াল হয় তাঁর হাতে এখনও ধরা শেষ বিস্কুটের প্যাকেটটা। তিনি এবার সেটা খুলে ফেললেন। তারপর খাওয়াতে থাকলেন সেগুলো তাঁর বড় আদরের পোষ্যদের। আর খাওয়াতে-খাওয়াতেই তাঁর মনে পড়ে গেল ফের কালুর কথা। 
প্রসেনজিতবাবুর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠল মুহূর্তের মধ্যে।

------------------------------------------

Comments :0

Login to leave a comment