নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা
শারদোৎসব এর আনন্দ
রাজ মন্ডল
২১ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
শারদোৎসব বাঙালির জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আনন্দময় উৎসব। শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাকে সাধারণভাবে শারদোৎসব বলা হয়। এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আবেগ এবং মিলনমেলার এক অনন্য প্রকাশ। বছরের অন্য সব সময়ের তুলনায় শারদোৎসবের সময় মানুষের মনে আনন্দ, উৎসাহ এবং উচ্ছ্বাসের এক বিশেষ সঞ্চার ঘটে।
শরৎকাল প্রকৃতির এক মনোরম ঋতু। বর্ষার বিদায়ের পর আকাশ হয়ে ওঠে নির্মল ও নীল। সাদা তুলোর মতো মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়। মাঠে মাঠে কাশফুল দোল খায়, আর শিউলি ফুলের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ যেন ঘোষণা করে দেয় যে মা দুর্গার আগমনের সময় এসে গেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মনও তখন আনন্দে ভরে ওঠে।
শারদোৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো দুর্গাপূজা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গা অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। মহালয়ার মাধ্যমে পূজার সূচনা হয় এবং ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী পর্যন্ত উৎসব চলে। এই কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে এক বিশেষ আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে।
শারদোৎসবের অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কুমোরটুলিতে বা বিভিন্ন মৃৎশিল্পীর কর্মশালায় প্রতিমা তৈরির কাজ চলে। শিল্পীরা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে মা দুর্গা এবং তাঁর সন্তানদের প্রতিমা নির্মাণ করেন। প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অনেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে যান এবং শিল্পীদের প্রশংসা করেন।
পূজার সময় বিভিন্ন জায়গায় আকর্ষণীয় প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। কোথাও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আদলে, কোথাও আবার আধুনিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্যান্ডেল সাজানো হয়। আলোকসজ্জা, রঙিন সাজসজ্জা এবং নান্দনিক পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সন্ধ্যার পর প্যান্ডেলগুলো আলোয় ঝলমল করে ওঠে এবং চারদিকে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
শারদোৎসবের অন্যতম আনন্দ হলো নতুন পোশাক পরা। ছোট-বড় সবাই নতুন জামাকাপড় কেনে এবং উৎসবের দিনগুলোতে সেগুলো পরে আনন্দ করে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা নতুন পোশাক পাওয়ার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে। পূজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ছবি তোলা এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়া তাদের কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
প্যান্ডেল হপিং বা এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করা শারদোৎসবের একটি জনপ্রিয় অংশ। পরিবার, বন্ধু এবং আত্মীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কোথাও ঢাকের বাদ্য, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবার কোথাও সংগীত পরিবেশনা—সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
ঢাকের শব্দ শারদোৎসবের প্রাণ। ঢাকিরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে পূজামণ্ডপে ঢাক বাজান। ঢাকের তালে তালে মানুষের মন আনন্দে নেচে ওঠে। বিশেষ করে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধ্যায় ঢাকের বাদ্য এবং ধুনুচি নাচ উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ধূপের সুগন্ধ, শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনি পরিবেশকে পবিত্র ও উৎসবমুখর করে তোলে।
শারদোৎসব সামাজিক সম্প্রীতিরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই উৎসবে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সবাই একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করেন এবং উৎসবের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এর ফলে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়। শারদোৎসব আমাদের শেখায় যে আনন্দ ভাগ করে নিলে তা আরও বেড়ে যায়।
এই উৎসবের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। পূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। পোশাকের দোকান, মিষ্টির দোকান, খেলনার দোকান এবং অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। অনেক মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। শিল্পী, কারিগর, আলোকসজ্জা কর্মী, সাজসজ্জা শিল্পী এবং ঢাকিরা এই সময় বিশেষভাবে উপকৃত হন।
শারদোৎসবের সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা জাগিয়ে তোলে। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে এই উৎসব কেবল ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি আমাদের কিছু দায়িত্বও রয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধ, শব্দদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিমা বিসর্জনের সময় নদী বা জলাশয়ের পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সবার নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে। এই সময় মানুষের মনে আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা বিষাদের সুরও বাজে। সবাই মা দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরে আবার আসার আহ্বান জানান। “আসছে বছর আবার হবে” এই আশাই মানুষের মনে নতুন আনন্দের সঞ্চার করে।
পরিশেষে বলা যায়, শারদোৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। এটি আনন্দ, সম্প্রীতি, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। এই উৎসব মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং সমাজে ঐক্য ও সৌহার্দ্যের বার্তা পৌঁছে দেয়। তাই শারদোৎসবের আনন্দ বাঙালির জীবনে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
সপ্তম শ্রেণী কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা
Comments :0