মধুসূদন চ্যাটার্জি: সোনামুখী
তন্ত্র সাধনায় ধর্মীয় উন্মাদনায় প্রথমে নিজের আঙ্গুল কেটে পরে স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ির সবজি কাটার বটি দিয়ে মাথা কেটে হত্যা করল সোনামুখীর দামোদর নদীর চর লালবাবা চরের বাসিন্দা মঙ্গল চৌধুরী(৪৫)। স্ত্রী রাম্পা(৪০)-র কাটা মুন্ডু নিয়ে বাড়ির সামনে নিজের তৈরি কালী মন্দিরে সেই মুন্ডু রেখে বাবা রাজেন্দ্র চৌধুরী( ৬৪)-কে ডেকে তাঁর গলাতেও বটির কোপ মেরে হত্যা করল ছেলে মঙ্গল। এখানেই শেষ নয়, হাতে ধারানো অস্ত্র নিয়ে ভাই রামলক্ষণ চৌধুরীকেও বলি দিতে যায় মঙ্গল। কোনক্রমে তিনি পালিয়ে যান। বাংলার শারদীয়া উৎসবের দ্বিতীয় দিনে, গত সোমবার ( ১৯ অক্টোবর) এই মধ্যযুগীয় নৃশংসতা ঘটল বাংলার প্রত্যন্ত নদী চর এলাকা বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর ডিহিপাড়া ও পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা ব্লক এলাকার মধ্যবর্তী এই লালবাবা চরে।
সোনামুখী থানার পুলিশ সোমবার রাতেই অপরাধী মঙ্গল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে। সোনামুখী থানার ইনস্পেকটার ইন চার্জ (আই সি) তাপস দত্ত জানান, ‘‘ভয়াবহ ঘটনা, মঙ্গল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেহ দুটিকে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বিষ্ণুপুরে। পুলিশ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে’’।
এদিকে সোমবারের এই ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মানুষের বক্তব্য, এই মঙ্গল চৌধুরী দিনের পর দিন গ্রামে নিজেকে তান্ত্রিক বলে ঘুরে বেড়াত। গত ৫ মাস ধরে তার এই তন্ত্র সাধনা আরও বেড়ে যায়। প্রকাশ্যে বলতে থাকে, এবার সত্যিকারের ধর্ম প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে। তার হাবভাবের মধ্যেও হিংস্রতা ফুটে ওঠে। ‘‘ প্রতিদিনই রাতে মঙ্গল সামনের কালি মন্দিরে তন্ত্র করত। বাইরে থেকে কয়েক মাস ধরে বেশ কিছু তান্ত্রিক আসতেন। আমরাও ওর কাজ দেখে ভয় পেতাম, সোনামুখী থানার পুলিশকেও আমরা এই ঘটনার কথা আগেই জানিয়েছিলাম, পুলিশ একবার গ্রামে এসেও ছিল। কিন্তু কিছুই করেনি। মঙ্গলের এই কাজ দিনের দিন বেড়েই চলেছিল। সে যে নিজের স্ত্রী বাবা কে বলি দেবে তা বুঝতেও পারিনি’’, বৃটেন গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণমুরালী চৌধুরী। তিনি বলেন, "যে ধর্মের নামে নিজের বাবা, স্ত্রী কে বলি দিয়ে কালি মূর্তির সামনে তাঁদের কাটা দেহ রাখতে পারে সে ছাড়া পেলে তো আমাদেরকেও হত্যা করবে, তাই এই জঘন্য অপরাধির কঠোর শাস্তি চাই আমরা।"
কী ঘটেছিল সোমবার রাতে?
বাঁকুড়া জেলার উত্তর প্রান্তে ডিহিপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের এই লালবাবার চর এলাকায় বহু বছর ধরে মানুষ বাস করে আসছেন। সোনামুখী থেকে দামোদর পেরিয়ে এই গ্রামে আসতে হয়। অত্যন্ত দুর্গম এলাকা। দু'টি নৌকা সারাদিনে চলে। জল কমে গেলে প্রায় ৫ কিলোমিটার নদীর মাঝে বালির ভেতর দিয়ে আসতে হয় গ্রামে। এখানে বাসিন্দাদের মধ্যে বিহার থেকে বহু বছর আগে আসা মানুষজন বহু আছেন। এঁরা গরিব খেটে খাওয়া মানুষ। নদীর চরের জমি চাষ করেন এঁরা। মঙ্গল চৌধুরীও জমি চাষ করত। আর্থিক ভাবে দুর্বল। লেখাপড়া শেখেনি সেভাবে। তার বাবা রাজেন্দ্রও কিছু করতে পারতেন না। বাবা রাজেন্দ্র থাকত পাশেই ভাই রামলক্ষণ চৌধুরীর কাছে। মঙ্গলের দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে রামবালক চৌধুরী ৭ বছর আগে বর্ধমানে হারিয়ে যায়। মঙ্গলের সঙ্গেই সে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছিল। মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল সে। তার ছোট ছেলে মনোজ চৌধুরীও মানসিকভাবে অসুস্থ। বড় ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর মঙ্গল গ্রামের শ্মশানে পূজো করতে শুরু করে। কয়েক বছর আগে তার বাড়ির সামনে সে বাঁশের দেওয়াল দিয়ে একটি কালি মন্দির করে পুজো করত। পরে তন্ত্র সাধনা করতে থাকে। তার স্ত্রী রাম্পাও তার সঙ্গে যোগ দেয় তন্ত্র সাধনায়, জানান মঙ্গলের বোন পুষ্পা দেবী। গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গলের পাশের বাড়ির বাসিন্দা শীলা চৌধুরী, শোভা চৌধুরীরা মঙ্গলবার সকালে জানান, রাতের বেলায় উলঙ্গ হয়ে মঙ্গল গ্রামে ঘুরে বেরাত। আমরা ভয় পেতাম। খালি বলত এবার আমাকে কে আটকায়, আমার সাধনা এবার সফল হবে। এটা ৫-৬ মাস ধরে শুরু করেছে। পুলিশকে বলা সত্বেও কিছু হয়নি। ভয়ে ভয়ে থাকতাম আমরা। তাঁরা জানান, সোমবার বাবা, স্ত্রী কে বলি দেওয়ার পর সে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘‘ মা কালি রক্ত চেয়েছিল, আমি দিলাম’’। সারা গ্রাম ঐ রক্তমাখা বটি নিয়ে তান্ডব করতে থাকে। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আমাদের গ্রামে আগে কোনদিন তান্ত্রিক আসেনি, ইদানিং ৫-৬ মাস হল তান্ত্রিকের আসা যাওয়া বেড়ে গিয়েছিল। কেন আমরা জানিনা।
মঙ্গলের ভাই রামলক্ষণ চৌধুরী জানান, আমি ঘরের মধ্যেই সোমবার রাতে ছিলাম। রাত ৭.৩০ নাগাদ মঙ্গল এসে কড়া নাড়তে থাকে। দরজা খুলেই দেখি সে উন্মাদের মতো চিৎকার করছে। আমাকে কাটতে আসছে। ছুটে কোনমতে আমি পালিয়ে যাই। পরে শুনি বাবা ও বৌদিকে বলি দিয়েছে।
হাড় হিম করা এই ঘটনা কি শুধু মাত্র তন্ত্র সাধনার ফসল? নাকি ধর্মীয় উন্মাদনার পরিবেশ একটা কাজ করছে? এই প্রশ্ন উঠছে রাজ্যজুড়ে। কেন পুলিশকে বারংবার বলার পর পুলিশ কোন ব্যবস্থা নিল না? এই প্রশ্ন রেখেছেন সোনামুখীর মানুষ।
মঙ্গলবার সকালেই গ্রামে যান সোনামুখীর প্রাক্তন বিধায়ক অজিত রায় ও অন্যা অনেকে। মঙ্গলের বাড়ির সামনে দুজন সিভিক ভলেন্টিয়ার রাখা হয়েছে। বলি দেওয়ার জায়গাগুলি পুলিশ দড়ি দিয়ে কর্ডন করে রেখেছে।
এদিন বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য নেতা জয়দেব চন্দ্র জানান, দু একদিনের মধ্যেই আমরা ঐ গ্রামে যাব। প্রশাসনকেও জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে এই সব বুজরুকির বিরুদ্ধে। গোটা গ্রাম এই মুহূর্তে যেন অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। ধর্মের নামে কিভাবে এক একবিংশ শতাব্দীতেও দুজনকে বলি দেওয়া যায় তা আর ফের দেখা গেল। এই উন্মাদনার শেষ কোথায়?
Comments :0