Uttar Pradesh

মোদীর গড় বারাণসীতে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টির বড় জয়, ২০২৭-এর আগে চাপে বিজেপি

জাতীয়

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীতে বড়সড় সাফল্য পেল অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি)। উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের নির্বাচনে বারাণসী শিক্ষক কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখার পাশাপাশি স্নাতক কেন্দ্রেও নির্ণায়ক জয়ের পথে সমাজবাদী পার্টি। আগ্রা শিক্ষক কেন্দ্রেও জয় পেয়েছে তারা। ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ফলকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে সমাজবাদী পার্টি। তবে ১১টি আসনের সামগ্রিক লড়াইয়ে বিজেপির পাল্লাই ভারী। পাঁচটি আসনে জয়ের পাশাপাশি আরও একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে গেরুয়া শিবির।
উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের নির্বাচনে বিজেপি লখনউ শিক্ষক, মিরাট-সহরানপুর শিক্ষক, বেরিলি-মোরাদাবাদ শিক্ষক এবং মিরাট-সহরানপুর স্নাতক কেন্দ্র-সহ একাধিক আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর কেন্দ্র বারাণসীতে সমাজবাদী পার্টির সাফল্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে।
বারাণসী শিক্ষক কেন্দ্রের নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী প্রমোদ কুমার মিশ্রকে ৪,৮৯৮ ভোটে পরাজিত করেছেন সমাজবাদী পার্টির লাল বিহারী যাদব। ২০২০ সালের নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়ে মিশ্র মাত্র ৯৩৬ ভোটের ব্যবধানে লাল বিহারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার ব্যবধান অনেকটাই বাড়িয়ে নিজেদের দখলে থাকা আসন ধরে রাখল সমাজবাদী পার্টি।
অন্যদিকে, বারাণসী স্নাতক কেন্দ্রেও বিজেপি প্রার্থী কেদারনাথ সিংকে হারিয়ে সমাজবাদী পার্টির আশুতোষ সিনহার নির্ণায়ক জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জয়ের পর লাল বিহারী যাদব বলেন, শিক্ষকরা সমাজবাদী পার্টির পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অখিলেশ যাদবের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে দল শক্তিশালী লড়াই করতে পেরেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদবকে তাঁর অনুগামীরা ‘নেতাজি’ বলে সম্বোধন করতেন। লাল বিহারীর বক্তব্য, একসময় শিক্ষক সমাজের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন মুলায়ম। শিক্ষকদের প্রতি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে অখিলেশেরও।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে বিতর্কিত ইউজিসি বিলের প্রসঙ্গও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য মোকাবিলায় নিয়মকানুন প্রণয়নের প্রস্তাব ঘিরে এই বিল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট বিলটির কার্যকারিতায় স্থগিতাদেশ দেয়।
তবে এই বিল নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলেনি বলে দাবি করেছেন লাল বিহারী যাদব। তার বক্তব্য, বিলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই মতভেদ ছিল। চাকরির নিরাপত্তা যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তারা সমাজবাদী পার্টির পাশেই থেকেছেন।
বারাণসীর ফলকে আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে সমাজবাদী পার্টি। দলের নেতাদের দাবি, বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে এই ফল স্থানীয় স্তরে জনমতের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমাজবাদী পার্টির নেতারা ২০১৪ ও ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদীর জয়ের ব্যবধান কমে আসার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রথম দিকে পিছিয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস প্রার্থী অজয় রাইকে দেড় লক্ষেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেন মোদী।
বারাণসী ক্ষেত্রে বারাণসী ছাড়াও চান্দৌলি, গাজিপুর, জৌনপুর, মির্জাপুর, সোনভদ্র, ভদোহি ও বলিয়া জেলা রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে সমাজবাদী পার্টির শক্তি বৃদ্ধি হলে তার প্রভাব বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন দলের নেতারা।
বারাণসীর ফল সামনে আসতেই শিক্ষক সমাজের ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর বার্তা দিয়েছেন অখিলেশ যাদব। সমাজমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি সরকারের আমলে শিক্ষকরা অপমান ছাড়া কিছুই পাননি। শিক্ষকদের দিয়ে পশুখাদ্য সংগ্রহের মতো অবাঞ্ছিত কাজে যুক্ত করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
অখিলেশের বক্তব্য, ২০২৭ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে পরাজিত করে শিক্ষকরা তাদের ‘গুরু সংকল্প’ পূরণ করবেন। শিক্ষকদের এই ক্ষোভ আগামী বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে সমাজবাদী পার্টি।
কংগ্রেস নেতা শ্রীবৎসও সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্রেই শিক্ষিত শিক্ষক ও স্নাতক ভোটারদের সমর্থন হারানো বিজেপির কাছে বড় ধাক্কা।
বারাণসীতে সমাজবাদী পার্টির সাফল্য নজর কাড়লেও উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের নির্বাচনে সামগ্রিকভাবে ভালো ফল করেছে বিজেপি। পশ্চিম ও উত্তর উত্তরপ্রদেশের একাধিক কেন্দ্রে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শিক্ষক ও স্নাতক কেন্দ্রের নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো সর্বস্তরের ভোটারের মনোভাবের সরাসরি প্রতিফলন নয়। এই নির্বাচনে কেবল নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন এবং ভোটার তালিকাভুক্ত শিক্ষক ও স্নাতকরাই ভোট দিতে পারেন। ফলে এই ফলাফল থেকে রাজ্যের সামগ্রিক জনমত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তবে দলীয় সংগঠন, স্থানীয় স্তরের সমীকরণ এবং নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীর অসন্তোষ বোঝার ক্ষেত্রে এই ফল গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় বিধান পরিষদে শিক্ষক ও স্নাতকদের জন্য পৃথক নির্বাচনী ক্ষেত্র রাখার ধারণার পিছনে যুক্তি ছিল, শিক্ষিত ও পেশাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব আইনসভায় বিশেষ অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, বারাণসীতে সমাজবাদী পার্টির জয় অখিলেশ যাদবকে ২০২৭ সালের লড়াইয়ের আগে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নিজের লোকসভা কেন্দ্রে এই ফল বিজেপির কাছে স্থানীয় স্তরের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিলেও, বিধান পরিষদের সামগ্রিক ফলাফলে এখনও এগিয়ে গেরুয়া শিবির। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে এই দুই দলের লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Comments :0

Login to leave a comment