গত মরশুমের লোকসানের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নতুন করে সংকটের মুখে উত্তরবঙ্গের আলু চাষ ও ব্যবসা। হিমঘরে এখনও বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত। অন্যদিকে চাহিদা কমায় মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রাক্-মরশুমি আলুবীজের বাজারও। গত বছর যে বীজের প্যাকেট ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার তা নেমে ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় এসেছে। ফলে আলুর দাম ও বীজের দরপতনে চাষি থেকে ব্যবসায়ী—সকলেই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায়। এই পরিস্থিতিতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও সহায়তার দাবি উঠেছে।
প্রতি বছর পাঞ্জাব থেকে উত্তরবঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্রাক আলুবীজ আসে। এরমধ্যে ৮০০ থেকে ৮৫০টি ট্রাকে প্রাক্-মরশুমি আলুবীজ থাকে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৫০ কেজির ৪০০টি প্যাকেট থাকে।পাঞ্জাব থেকে ধূপগুড়িতে বীজ পৌঁছানোর পরিবহণ খরচই প্যাকেট পিছু প্রায় ৩০০ টাকা। ফলে বাজারে চাহিদা না থাকায় ব্যবসায়ীদের একাংশকে প্যাকেট প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লোকসানে বীজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বীজ ব্যবসায়ী অজিত সিং বলেন, ‘‘আলুবীজ অত্যন্ত সংবেদনশীল। বেশিদিন মজুত করে রাখা যায় না। বিক্রি না হলে বীজ পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’’
জলপাইগুড়ি জেলায় প্রতি বছর গড়ে ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ হেক্টর জমিতে প্রাক্-মরশুমি পোখরাজ আলুর চাষ হয়। মূলত তিস্তা ও জলঢাকা নদীর চরাঞ্চলে এই চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু গত মরশুমের লোকসানের কারণে কৃষকদের একাংশ এবার চাষের খরচ বহন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বীজ কেনা ও চাষের ব্যাপারেও অনেকের আগ্রহ হারাচ্ছেন।অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রে খবর
অসমের বরপেটা, গোয়ালপাড়া ও তিলুকিয়াড়ায় আলু চাষের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের আলু উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংকটের ছায়া হিমঘর গুলিতেও।নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমঘর থেকে আলু বের করার সময়সীমা শেষ হবে। অথচ উত্তরবঙ্গের হিমঘরগুলিতে এখনও ৪০ শতাংশের বেশি আলু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সাধারণত প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আলু হিমঘর থেকে বের হলেও এবার সেই গতিতে আলু বিক্রি হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গ হিমঘর সমিতির উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কমিটির সম্পাদক মনোজ সাহা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলু বের করা সম্ভব না হলে হিমঘর মালিকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। ব্যাঙ্কের ঋণ পরিশোধ এবং বিদ্যুতের বিল মেটানোও কঠিন হয়ে উঠবে।
উত্তরবঙ্গ আলু ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য তপন পাল বলেন, ‘‘কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের অবস্থাও শোচনীয়। বীজের বাজারে এই বিপুল লোকসানে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রত্যেকেই এখন পুঁজি বাঁচানোর লড়াই করছেন।’’
সারা ভারত কৃষকসভার জেলা নেতা মুকুলেশ রায় সরকার বলেন, হিমঘরে থাকা অবিক্রীত আলু ও দরপতন হওয়া বীজের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষক সভার পক্ষ থেকে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ ও সহায়তার দাবি জানানো হয়েছে।
নতুন মরশুমে জ্যোতি ও চন্দ্রমুখী আলুর চাষ শুরুর মুখে প্রাক্-মরশুমি বীজের বাজারে এই মন্দা কৃষকদের সিদ্ধান্তকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। একদিকে হিমঘরে পড়ে থাকা আলু, অন্যদিকে বীজের দরপতন—জোড়া সংকটে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের আলু অর্থনীতি। এই পরিস্থিতি কাটাতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে দ্রুত সরকারি উদ্যোগের দাবি উঠেছে।
North Bengal Potatoes
বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত হিমঘরে, বিপাকে উত্তরবঙ্গের কৃষক-ব্যবসায়ীরা
×
Comments :0