দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দেওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ পড়ুয়া স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। স্কুলে শিক্ষার উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, পাঠ্যবই না মেলা, নতুন প্রযুক্তির শিক্ষা পাঠক্রমের সঙ্গে পড়ুয়ার দূরত্ব তৈরি, পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছে। সংসদীয় কমিটি তার রিপোর্টে একথা উল্লেখ করেছে।
সুলভে উন্নত মানের শিক্ষার লক্ষ্যে তার বাজেট ও নীতি এবং সেন্ট্রাল বোর্ড অব এডুকেশনের পর্যালোলোচনা নিয়ে সংসদীয় এস্টিমেট কমিটি বুধবার সংসদে এনিয়ে রিপোর্টে পেশ করেছে। তাতে স্কুল শিক্ষার গাফিলতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে দেশে স্কুল শিক্ষায় বেহাল অবস্থার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তাতে জানানো হয়েছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুল বেশি, অথচ মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল তার তুলনায় কম। যে সংখ্যায় প্রাথমিক স্কুল রয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল। কমিটি জানাচ্ছে, স্কুল শিক্ষায় কেন্দ্রের বরাদ্দ কমেছে। অর্থের অভাবে বেশির ভাগ স্কুলের পরিকাঠামো প্রায় ধসে পড়েছে।
এস্টিমেট কমিটি স্কুল শিক্ষা নিয়ে তাদের দশম রিপোর্টে মান বাড়িয়ে স্কুলছুট বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুলের সংখ্যা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউনাইটেড ডিস্ট্রিক ইনফরমেশন সিসটেম (ইউআইডিসি) সুত্রে জানা গিয়েছে, দেশে ২০২৪-২৫ সালে সরকারি এবং সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত মোট ১০,৯২,৬৭১ স্কুল। প্রাথমিক এবং উচ্চ প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হলো যথাক্রমে ৯,১১,০৩২টি এবং ৪,১২,৮০৫টি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্কুল হলো ১,৬১,৮০৮টি। উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৯০,৮৬৬ টি। দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা সেই হারে বাড়েনি। রিপোর্টে উচ্চ প্রাথমিক স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটিয়ে তাদের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
দেখা গিয়েছে, প্রতি উঁচু ক্লাসে পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, প্রাথমিক এবং উচ্চ প্রাথমিকে পড়ুয়ার সংখ্যা হলো যথাক্রমে ৬,১৮,৪৫,০৩৫ এবং ৪,০৮,৯৩,৯৭৮। সেই পড়ুয়ার সংখ্যা মাধ্যমিকে কমে হয়েছে ২,৩৬,৬৮,২২০। উচ্চমাধ্যমিকে তা আরও কমে হয়েছে ১,৬৪,১৭৯৪৯। ইউআইসিসি এই তথ্য পেশ করে জানাচ্ছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়ার সংখ্যা চরম হারে কমছে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ শতাংশ। স্কুলে ১০০ জন পড়ুয়ার মধ্যে মাত্র ২৩ জন পড়ুয়া উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষায় বসছে।
কমিটি তার রিপোর্টে শিক্ষা বেহাল অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে অবিলম্বে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। যেহেতু স্কুল শিক্ষা যৌথ তালিকায়, তাই কেন্দ্রের সরকারের উচিত রাজ্য সরকারগুলিকে স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে উৎসাহিত করা। স্কুলছুট বন্ধে দ্রুত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। স্কুলের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে স্কুল শিক্ষা পাঠক্রমে যে গলদ রয়েছে তার সংশোধন করার সুপারিশ করেছে কমিটি। বলা হয়েছে, স্কুলের সরকারি পাঠ্যবই সময়মতো মেলে না। ফলে পড়ুয়ারা স্কুলে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। স্কুলে যে ডিজিটাল শিক্ষাক্রম চালু করা হলেও বেশিরভাগ স্কুলে উপযুক্ত পরিকাঠামোমো নেই। এতে পড়ুয়াদের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণে একটা বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বেশিরভাগ স্কুলের পড়ুয়াদের কাছে ডিজিটাল শিক্ষা সহজভাবে বোধগম্য করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্কুলের আগ্রহ হারিয়ে মাঝপথে অনেকে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে বলে কমিটি জানিয়েছে। এনসিআরটি পাঠ্যবই প্রকাশ এবং সংশোধিত পাঠক্রমের বই প্রকাশ নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে সমালোচনা করেছে কমিটি। তারা জানিয়েছে, স্কুলে এনসিআরটি পাঠ্যবই সময়মতো মেলে না। ফলে ক্লাসে পুরানো পাঠক্রমের বই দিয়ে ক্লাস চলে।
আবার শিক্ষক প্রশিক্ষণে সিবিএসই যে অনলাইন ব্যবস্থা করেছিল তা নিয়ে আগ্রহ হারিয়েছেন শিক্ষকরা।ভনয়া শিক্ষানীতি চালু হওয়ার পর ২০২২ সালে অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৫৩ লক্ষ শিক্ষক। ২০২৫ সালে অনলাইনে মাত্র ১.৬ লক্ষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনলাইন এবং ডিজিটাল শিক্ষা পাঠক্রম নিয়েও পড়ুয়াদের মতো শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। সরকারি স্কুলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বিনামুল্যে মিললেও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিতে অর্থ খরচ করতে হয়। গ্রামে, আধা শহরে বেসরকারি স্কুল তাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে কোনও খরচ বহন করা হয় না। ফলে বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষার প্রশিক্ষণ মেলে না।
স্কুল শিক্ষার সঙ্কট নিয়ে কমিটি কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে দুষেছে। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার মিলে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হলো মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৪.২ শতাংশ। আক্ষেপের সঙ্গে কমিটি জানাচ্ছে, নয়া শিক্ষানীতি ২০২০ শেষ বছরে পৌঁছেছে, তবু দেখা যাচ্ছে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। শিক্ষার উন্নয়নে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক শিক্ষা ক্ষেত্রে খরচের আর্থিক রোডম্যাপ তৈরির করার সুপারিশ করেছে কমিটি। এক্ষেত্রে বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ৬ শতাংশ খরচের সুপারিশ করেছে কমিটি।
drop out before Class 12
দ্বাদশে পৌঁছানোর আগেই স্কুলছুট ৭৩ শতাংশ পড়ুয়া, রিপোর্ট সংসদীয় কমিটির
×
Comments :0