Post editorial

ঋণ ও মোদী নির্ভর বাজেট

উত্তর সম্পাদকীয়​

বিজেপি’র রাজ্য সরকারের প্রথম বাজেট পেশ হয়েছে সোমবার। পশ্চিমবঙ্গে ‘সনাতন সংস্কৃতি’ প্রসারের লক্ষ্যে এই বাজেটের মূল ভরসা তিনটি— বাজার থেকে ঋণ, মদ বিক্রি থেকে উপার্জিত শুল্ক আর কেন্দ্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি। 
সেক্ষেত্রে আগের তৃণমূল সরকারের পথেই অনেকটা এগিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’। তৃণমূল সরকার রাজ্যের মোট ধার ৭,৬২,৩২৬ কোটি ৬১ লক্ষ টাকায় পৌঁছে বিদায় নিয়েছে। ২০১১’তে এই ঋণ ছিল ১,৯২,৯১৯.৯ কোটি টাকা। সোমবার বিধানসভায় পেশ হওয়া রাজ্য বাজেট জানাচ্ছে, চলতি আর্থিক বছরে রাজ্যের বিজেপি সরকার বাজার থেকে আরও ধার করবে ৮০,৪৪৪ কোটি টাকা। মোট বাজেট ৪,৩৮,৭৭৫ কোটি ২৯ লক্ষ টাকার। অর্থাৎ বাজেটের প্রায় ১৯ শতাংশ টাকা আসবে বাজার থেকে ধার করে।  
এই পথ বিপর্যয়ের পথ। আগামী এপ্রিলের আগে রাজ্যের মাথাপিছু ধারের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৮১,৫৮৯ টাকা। বাজেট পেশের পর বিধানসভার প্রেস কর্নারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিক সম্মেলনে ‘পথ’ নিয়ে বলেছেন, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দেখানো পথেই আমরা চলব, বাংলা চলবে। বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম, ইসকনের পথে বাংলা চলবে। সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুতি ঘটবে না।’’
রাজ্যের মানুষের কাঁধে ধার চাপিয়ে চলাকে ‘সংস্কৃতি’ বানিয়ে দিয়ে গেছেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কিংবা বিবেকানন্দ এমন কোনও পথের কথা, ‘সংস্কৃতি’র কথা বলেননি।
বাজেটে নতুন ঘোষণাও আছে। যেমন, ১ লক্ষ নিয়োগ হবে সরকারি চাকরিতে। তার মধ্যে ৫০ হাজার হবে শিক্ষক পদে। জঙ্গীপুরে ভাঙন রোধে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী, আধা সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও কর্মীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে, যা আগামী ১ অক্টোবর থেকে মিলবে, কলেজের অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে, সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য ১২০০ কোটি টাকা, সেচের জন্য কৃষকদের ইউনিট পিছু ২ টাকা হিসাবে ভরতুকি, গোশালা বানাতে ১ লক্ষ টাকা ভরতুকি দেওয়া হবে প্রভৃতি। কিন্তু এজন্য আয় আসবে কোথা থেকে, তার হদিশ তেমন স্বচ্ছ নয়।
রাজ্যের অর্থ মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত আরএসএস’র ঘরের লোক। সঙ্ঘের বিশ্বস্ত। তৃণমূল সরকারের প্রথম অর্থ মন্ত্রী অমিত মিত্রও ছিলেন নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বস্ত এবং সঙ্ঘের কর্মী। বাজেটে দুই অর্থ মন্ত্রীর সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠতা ছাড়াও মদের উপর রাজ্যের উপার্জন-নির্ভরশীলতার একটি সাদৃশ্য আছে। বিজেপি সরকারের বাজেট নথি জানাচ্ছে, চলতি আর্থিক বছরে আবগারি শুল্ক বাবদ প্রায় ২৪,৯২২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। গত আর্থিক বছরে তৃণমূল সরকারের এই ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২,৫৫০ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ আবগারি থেকে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিল বিজেপি সরকার। যদিও রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দিরের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন মদের দোকান থাকবে না। তার মানে এই নয় যে, রাজ্যে মদের দোকান কমবে, বরং বাড়বে।
রাজ্য বাজেটের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে কেন্দ্রীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি। বাজেট নথিতে জানানো হয়েছে, চলতি আর্থিক বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রান্ট-ইন-এইড বাবদ রাজ্য সরকার পাবে ৭১,৩৯৩ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে এত টাকার প্রতিশ্রুতি এর আগে রাজ্য সরকার পায়নি। কিন্তু সত্যিই কত টাকা পাওয়া গেল তা বোঝা যাবে আগামী আর্থিক বছরের শেষে। 
রাজ্য সরকার আগামী এক বছরে ১,৩০,৬৬৯ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা নিজস্ব কর বাবদ আদায় করবে। এই লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের থেকে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের খরচ বাবদ কর, যা রাজ্যের মানুষ এবং বিভিন্ন সংস্থার থেকে আদায় করবে, তার পরিমাণ ৪৭৮৬ কোটির বেশি টাকা। যা গত আর্থিক বছরের থেকে প্রায় ১২৮৬ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ বিদ্যুতের মাশুল কাঠামো পুনর্বিচারের যে প্রতিশ্রুতি ‘সঙ্কল্প পত্র’-এ বিজেপি দিয়েছিল, তা কতটা হবে, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। মাশুল কমবে না, এটি মোটামুটি নিশ্চিত; বলছে বাজেট নথি। 
রাজ্যে আগামী এক বছরে জমি, বাড়ির বাজার দারুণ বাড়বে, অন্তত বিজেপি’র রাজ্য সরকার তা মনে করছে না। বাজেটে তারা স্যাদাম্প অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন ফি থেকে আয় ধরেছে ১১,১০৯ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। যা গত আর্থিক বছরের তুলনায় মাত্র ১১০০ কোটি টাকা বেশি। বিক্রয় কর বাবদ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা গত আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় ৩৪০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় বিক্রয় করের মধ্যেই ধরা হয়। অর্থাৎ এই করে কোনও ছাড় রাজ্যবাসীর জন্য বিজেপি সরকার দেবে বলে আশা করা যাচ্ছে না।
গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘সঙ্কল্প পত্র’ ঘোষণা করেছিল বিজেপি। বাজেটে সেই সঙ্কল্প পত্রের প্রতিশ্রুতিগুলির কিছু কিছু জায়গা পেয়েছে। কিন্তু অনেক প্রতিশ্রুতির চিহ্ন নেই। যেমন, ১) সঙ্কল্প পত্রে বিজেপি লিখেছিল, ‘‘পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরমুখী করতে এবং শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য আগামী পাঁচ বছরে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্র মিলিয়ে মোট ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’ অর্থাৎ বছরে ২০ লক্ষ মানুষের জন্য চাকরি ও স্বনির্ভরতার প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তবে রাজ্য বাজেটে ১ লক্ষ চাকরির ঘোষণা আছে। ‘বাংলার উদ্যম ক্রেডিট কার্ড’ প্রকল্পে ২ লক্ষ যুবককে সহায়তার ঘোষণা আছে। বাকি ১৭ লক্ষের কোন নির্দিষ্ট হিসাব নেই। একইভাবে ‘পরিযায়ী’দের জন্য কল্যাণ পর্ষদ তৈরির ঘোষণা আছে। কিন্তু তাঁদের ‘ঘরে ফেরানো’র কোনও পরিকল্পনা নেই। এছাড়া সঙ্কল্প পত্র অনুসারে যাঁরা মাইক্রোফিনান্স সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না, তাদের ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কোনও ঘোষণাও বাজেটে নেই। সঙ্কল্প পত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উৎসাহ দিতে, যেসব ছাত্রছাত্রীরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে তাদের এককালীন ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। সোমবার বাজেটে এমন কোন ঘোষণা করা হয়নি। সঙ্কল্প পত্রে লেখা হয়েছিল যে, ‘‘কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হলে কৃষককে বাজারদরের চার গুণ মূল্য এবং দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পে সেই কৃষকের কর্মসংস্থানের সুযোগও থাকবে।’’ এমন কোনও ঘোষণা বিজেপি’র রাজ্য সরকারের বাজেটে নেই। 
কী আছে? আছে ধর্ম—  তাও শুধু হিন্দু ধর্মের ‘জাগরণের’ কথা। 
কী লেখা হয়েছে বাজেটে? ‘‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম প্রধান শক্তি। সরকারের লক্ষ্য হল রাজ্যের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য ও সনাতন সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রাখা, তার প্রসার ঘটানো এবং প্রগতিশীল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠন।’’ অথচ শুধুমাত্র ‘দুর্গাপূজা হল বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মা’। ‘হেরিটেজ কমিশন’ পুনর্গঠনের ঘোষণার পাশাপাশি তার কাজ হিসাবে কালীঘাট, তারাপীঠ, তারকেশ্বর, কঙ্কালীতলার মত হিন্দু ধর্মের ‘ঐতিহ্য বহনকারী স্থানগুলির পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাঙ্গীন পরিকল্পনাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। না আছে বৌদ্ধ ধর্মের পীঠস্থানের কথা। না আছে ইসলাম ধর্মের স্থানগুলির কথা। আছে মায়াপুরকে নিয়েও তিন বছরে ১ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পণার ঘোষণা।
কেন এই আয়োজন? বাজেট নথির গোড়াতেই বলে দেওয়া হয়েছে, ‘‘এই ভূমি শক্তি ও ভক্তির ভূমি। আজ যেহেতু আমরা সভ্যতার আত্মা পুনরুদ্ধারে অঙ্গীকারবদ্ধ, আমরা জাগরিত শক্তির প্রেরণার ভিত্তিতে বাজেটের রূপরেখা তৈরি করেছি।’’
বোঝাই যাচ্ছে এই বাজেট হিন্দু ধর্ম স্থাপনার সরকারি প্রয়াসের নথি।

Comments :0

Login to leave a comment