হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ত শক্তি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতা স্থায়ীভাবে দখলের লক্ষ্যে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলিকে গ্রাস করতে মরিয়া ও বেপরোয়া। এমন আধিপত্যবাদী দখলদারির অন্যতম নমুনা নির্বাচন কমিশন।
নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন। স্বচ্ছ ও নির্বাচনে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী ও অটুট রাখাই কমিশনের কাজ এবং দায়বদ্ধতা। এই জায়গা থেকে বিচ্যুতি ঘটলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে কোনও রাজনৈতিক দল বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল এবং সরকারের কর্তব্য নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখার জন্য যা যা করণীয় তা করা। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বা সরকার যদি গণতন্ত্রের বদলে হিন্দুত্ববাদী একদলীয় একাধিপত্যে বিশ্বাস করে এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় একদলীয় শাসন কায়েম করতে চায় অর্থাৎ হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাহলে তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রত্যাশা করা যায় না। তারা পদে পদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল ও নড়বড়ে করতে চাইবে। প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে এবং সর্বস্তরে দলীয় প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করবে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ ও স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিরঙ্কুশ দলীয় প্রভাবাধীনে নিয়ে আসতে চাইবে। বস্তুত মোদীর নেতৃত্বে সেই কাজটিই নিখুঁতভাবে করছে সরকার।
নির্বাচন কমিশনে শাসকের একচেটিয়া আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনে দলীয় স্বার্থে কমিশনকে ব্যবহার করতে গোড়া থেকেই আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে সরকার। তারা জানে কমিশনকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলতে পারলে ভোটার তালিকা তৈরি থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই হাইজ্যাক করে নেওয়া যাবে। তখন দেদার কারচুপি বা ভোট লুটের মাধ্যমে যে কোনও নির্বাচনে শাসক দলের জয় সহজ হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে মোদী সরকারের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল আইন পরিবর্তন করে কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি বদল। মোদীকৃত নতুন আইনে কমিশনার বাছাইয়ের জন্য তিন সদস্যের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা ছাড়া তৃতীয় সদস্য হিসাবে প্রধান বিচারপতিকে ছাঁটাই করে সে জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কোনও মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের বা শাসক দলের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন অথবা অনুগামী ব্যক্তিকে কমিশনার করা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জ্ঞানেশের নিয়োগ হয়েছে এহেন একতরফা সিদ্ধান্তে। অর্থাৎ এমন ব্যক্তিকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করা হয়েছে যিনি মোদী-শাহ’র নির্দেশ হুবহু অনুসরণ করবেন। বস্তুত জ্ঞানেশের নেতৃত্বে কমিশন সেভাবেই কাজ করছে। বেআইনি ও একতরফা সিদ্ধান্তে কমিশনকে কার্যত ব্যক্তিগত জমিদারি বানিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে শাসক রাজনীতির প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ফেরানোই এখন ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিরোধী শক্তিকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। আর এই লড়াইয়ে জিততে হলে শুধুমাত্র বিরোধী দলসমূহের পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিসরকে প্রসারিত করতে হবে অনেক দূর পর্যন্ত। ইন্ডিয়া মঞ্চের বাইরে বিজেপি বিরোধী দলকে যেমন যুক্ত করতে হবে তেমনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী, সামাজিক আন্দোলনের কর্মী, লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক জগতের মানুষেরও ব্যাপক সমাবেশ ঘটাতে হবে। সিপিআই(এম) সহ বামপন্থী দলগুলি চলতি ও আসন্ন দেশজোড়া আন্দোলনে এমন আহ্বান জানিয়েছে। বস্তুত দেশজোড়া গণমানুষের গণপ্রতিবাদই পারবে এই ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে ভারতের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে।
Alliance of People Needed
চাই সব অংশের মানুষের জোট
×
Comments :0