বুধবার ভোরে ভারতের একেবারে গা ঘেঁষে ইরানের এক জাহাজে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন নৌবাহিনীর এক সাবমেরিনের নিক্ষেপ করা টর্পেডোর আঘাতে শ্রীলঙ্কার জলসীমায় অবস্থানরত ইরানের এক সামরিক জাহাজ ডুবে গিয়েছে। হামলার সময় জাহাজটিতে ১৮০ জন নাবিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮০ জনের নিহত হওয়ার নিশ্চিত করা গিয়েছে। বাকিরা এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ অথবা চিকিৎসাধীন। শ্রীলঙ্কার সরকার ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের সংঘাত অতি দ্রুত ভারত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় কোনও যুদ্ধ বা সংঘর্ষ এর আগে কখনও ভারতের সীমান্তের এত কাছে চলে আসেনি। এই হামলার বৈধতা বা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতি কতদূর রয়েছে, অন্য কোনও দেশের জলসীমায় ঢুকে আমেরিকা আদৌ হামলা চালাতে পারে কিনা তা নিয়ে অভিজ্ঞ মহলে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিন সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাতকারে মার্কিন বিদেশ সচিব পিট হেগসেথ সদর্পে ঘোষণা করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার কোনও শত্রু যুদ্ধ জাহাজে এমন হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানের এক যুদ্ধজাহাজ নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিল। তবে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডোতে তা ডুবে যায়। তবে হেগসেথের দাবি সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক জলসীমা নয়, অন্য একটি দেশের জলসীমা লঙ্ঘ করে এই হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ এই আচরণকে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছেন।
ডুবে যাওয়া জাহাজটি ইরানের নৌবাহিনীর সাউদার্ন ফ্লিটের অন্তর্গত একটি ফ্রিগেট। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানান, গলে শহরের থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থানকালে এদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে জাহাজটি বিপদসঙ্কেত পাঠায়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী সারাদিন ধরে উদ্ধার অভিযান চালায়।
শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাত পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে। ডুবন্ত জাহাজ থেকে অন্তত ৩০ জন নাবিককে উদ্ধার করে তীরে আনা হয়েছে। তাঁদের অনেকের অবস্থাই সঙ্কটজনক। আহতদের গলের কারাপিটিয়া টিচিং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কলম্বোর এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানান, ঘটনার সময় ফ্রিগেটটিতে প্রায় ১৮০ জন নাবিক ছিলেন। বুধবার বিকেল পর্যন্ত ১০০ থেকে ১৫০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
বিদেশ মন্ত্রী বিজিথা হেরাথ শ্রীলঙ্কার সংসদে নিশ্চিত করেন, ইরানের জাহাজটির বিপদসঙ্কেত পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী তা উদ্ধার করার অভিযান শুরু করে। তিনি বলেন, জাহাজটি শ্রীলঙ্কার আঞ্চলিক জলসীমার ঠিক বাইরে হলেও দেশের নির্ধারিত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অঞ্চলের মধ্যে ডুবছিল।
ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে জাহাজটি কোনও সাবমেরিনের নিক্ষিপ্ত অস্ত্রে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে।
তবে কোন সাবমেরিন দায়ী, তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি; তদন্ত চলছে। এই অঞ্চলে কোনও মার্কিন সাবমেরিন জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত বা অস্বীকার— কিছুই করা যাচ্ছে না। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন নিয়মিত ভারত মহাসাগরে টহল দেয়। দিয়েগো গার্সিয়ার মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী নজর রাখে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, ইরানের এই জাহাজটি সম্প্রতি বিশাখাপত্তনমে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউতে অংশ নিয়ে ফিরছিল। ইরানের নৌবাহিনীর এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা তুলনামূলক ভাবে বিরল। ফেব্রুয়ারিতে জাহাজটি বিশাখাপত্তনম বন্দরে বহু দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে নোঙর করেছিল। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে আগমনের সময় ভারতীয় নৌবাহিনী তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়।
ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের এই জাহাজটিতে অত্যাধুনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ৭৬ মিলিমিটার নৌ-কামান এবং টর্পেডো নিক্ষেপের ব্যবস্থা বহন করছিল। শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানের ভিডিও চিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে না, কারণ এতে অন্য একটি দেশের সামরিক সম্পদের উপস্থিতি রয়েছে।
Attack on Iranian Ship
ভারতের গা ঘেঁষে মার্কিন হানা! ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবে হত ৮০
×
Comments :0