SIR

এসআইআর ক্ষমতায় থাকার ও ক্ষমতা বদলের অস্ত্র

সম্পাদকীয় বিভাগ

অনিতা অগ্নিহোত্রী

যেন দুর্যোগের ঘনঘটা বাংলার আকাশে। ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সময় ফুরিয়ে গেল বাংলার প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের। প্রথম পর্যায়ের নমিনেশন ফাইলের পর ভোটার লিস্টে সংযোজন সম্ভব নয়। কেবল এবার নয়,সমস্ত নির্বাচনেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ম্যাপিং-এর শর্ত পূরণ করেও এত বিরাট সংখ্যক ভোটার কীভাবে বিচারাধীন রয়ে গেলেন, এ প্রশ্ন ভাবাচ্ছে, ক্ষুব্ধ করে তুলেছে আমাদের। কেন এই ঘটনা ঘটল কেবল বাংলাতেই, অন্য কোনও রাজ্যে নয়? বিচারাধীন ভোটারের কেসের শুনানি হতে পারে কেবল ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইবুনালগুলি কেস শোনা শুরু করার আগেই অনেকের সময় ফুরিয়ে গেল।
চারদিক থেকে মানুষের ক্ষোভ হাহাকার ভেসে আসছে। এইভাবে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিকভাবে আমরা নির্বাচন যাত্রা আরম্ভ করব? এবার ভোট দিতে পারবেন না, নাগরিকের আশঙ্কা কেবল এই কারণে নয়। বিচারাধীন কেসের নিষ্পত্তি ট্রাইবুনালে না হলে আজকের ভোটার কি নাগরিকত্ব হারাবেন? ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে তাঁকে?
কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর কনভয় রাম মন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে বাংলা অভিমুখে আসছে এবং খুব শীঘ্রই ৩০০০ কোম্পানির দু’লক্ষ জওয়ানের পদভারে কাঁপবে বাংলা। বাংলার দুর্গ দখলের জন্য কেন্দ্রীয় শাসক দলের অন্তিম লড়াই এবার কেবল রাজনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দলের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিও। এই আপাত অসম যুদ্ধে রাজ্য সরকারেরও বেশ কিছু দায়িত্ব ছিল কি? সেটাও এক বিচার্য বিষয় যাকে এসআইআর নামক কার্পেটের নিচে ঠেলে দেওয়া যায় না।
কলকাতার আর জি কর হাসপাতাল থেকে মালদহের মোথাবাড়ি অনেকটা পথ। কিন্তু এই দূরত্বটা না পেরোলে বোঝা যাবে না বাংলার বর্তমান অবস্থার, বিশেষ করে এসআইআর সঙ্কটের কারণ। মোথাবাড়ির বেশ কিছু বুথে বহু সংখ্যনক ভোটারের নাম বাদ গেছে। তারা এবং মালদহের অন্যত্র মানুষ বসেছিলেন প্রশাসনের কাছে কাগজপত্র জমা করার জন্য। দীর্ঘ সময় আটকে পড়া বিচারকদের মুক্ত করতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী হস্তক্ষেপ করতেই যে হিংসা আরম্ভ হয় তা লজ্জার। মিম-এর একজন প্রতিনিধি গ্রেপ্তার হয়েছেন, বেশ কিছু দুষ্কৃতী সহ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একে বলছেন দাঙ্গা এবং এতে তাঁর কোনও দায় নেই। দাঙ্গা না হলেও প্রতারণা করা হয়েছিল, যেভাবে মহিলা বিচারকের গাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছিল, মহিলার আর্তনাদ আমরা কানে শুনতে পেয়েছি, তাতে মনে হয় সমাজবিরোধীদের হাত এতে স্পষ্ট। অসংখ্য মানুষের বেদনার তুলাদণ্ডে এই দুষ্কর্মের সমর্থন করা যায় না।
গত ৯ আগস্ট ২০২৪-এ আর জি কর মেডিক্যানল কলেজে একজন তরুণী ডাক্তারের অন ডিউটি থাকার সময় তাঁকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা, কারণ হাসপাতালের নানা ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এগুলি জনসমক্ষে আনার কথাও লিখেছিলেন তিনি কর্তৃপক্ষকে। তাঁর হত্যার তদন্ত ঘটনার ১৯ মাস পরেও অসম্পূর্ণ, এবং একজন ছাড়া বাকি সম্ভাব্য অপরাধীদের চিহ্নিত করা যায়নি। ১৪ আগস্ট শাসকদল প্ররোচিত গুন্ডাবাহিনী আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে তাণ্ডব চালায়। হাসপাতালের সামনে বসে থাকা প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের অনুরোধ সত্ত্বেও পুলিশ সেই সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে রাজি হয়নি। সংবাদমাধ্যম সূত্রে এসব আমাদের জানা। কিন্তু অনেকেই জানতেন না, গত ১৯ মাস ধরে আর জি করের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ঠিক বন্ধ নয়, ট্রমা কেয়ারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জরুরি বিভাগের পরিষেবা দেওয়ার জন্য খোলার তোড়জোড় সবে আরম্ভ হয়েছে। তার কারণও দুটি মৃত্যু। একটি তো ভয়াবহ। খারাপ লিফট, অনুপস্থিত লিফ্ট‍ চালক। একজন যুবক দু’ঘণ্টা জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেন লিফ্টের মধ্যে। তাঁর স্ত্রী ও বাবার করুণ মিনতির পরও পুলিশ বা সিআইএসএফ কর্ণপাত করলেন না, উদ্ধারের কোনও চেষ্টাও করলেন না। অন্য ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ এক প্রৌঢ়কে হাঁটিয়ে বাইরের সুলভ শৌচালয়ে নিয়ে যাবার পর তাঁর মৃত্যু হয়। প্রথম ঘটনায় জানা গেল লিফ্ট খোলার চাবি থাকে পিডব্লুডি’র কাছে। দু’ঘণ্টাতেও চাবির দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারকে পাওয়া গেল না। আমাদের মনে আছে ৯ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরে সুপার তলব না করা সত্ত্বেও পিডব্লুডি’র সিভিল উইংয়ের তরফ থেকে লোকজন দ্রুত এসে অপরাধ স্থল সন্নিহিত বাথরুমে ও দেওয়ালে ভাঙচুর করে। উদ্দেশ্য: অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণ লোপাট। কে পাঠিয়েছিল তাদের? চোখের পলকে তারা কীভাবে বিনির্মাণ সম্পন্ন করে তা আজও রহস্যময়। একটি হাসপাতালের মধ্যে একটি হত্যা, তার সাক্ষ্য প্রমাণ লোপে সরকারের উৎসাহ, তদন্তে অবহেলা। তারপর এক বছর পর দুটি অকারণ মৃত্যু । তারই সূত্র ধরে জানা গেল হাসপাতালের ৩১টি লিফ্টের ১৯টি অকেজো, অধিকাংশ শৌচাগার বন্ধ বা বিকল। এমার্জেন্সির মরণাপন্নকেও বাইরে সুলভ শৌচাগারে যেতে হয়।
বাংলায় যেমন আছেন অসংখ্য গুণী, শান্তিপ্রিয় মানুষ, নিজের শ্রমের রোজগারে সংসার চালানো মানুষ, সবাই তোলাবাজ, লোভী বা পরজীবী নন, তেমন আর জি কর হাসপাতালেও আছেন বহু পরিশ্রমী, নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী। তবু কিভাবে যেন আর জি কর হাসপাতালে চলত দুর্নীতির চক্র, ভেজাল ওষুধের কারবার, নির্মম দমনতন্ত্র, যার অভিঘাত একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাতে শেষ হয়নি, ১৯ মাস ধরে বন্ধ থাকা জরুরি বিভাগ, বিকল লিফ্টে মানুষের মৃত্যু, কানে হেডফোন লাগানো সিকিউরিটি মৃত্যুর দরজায় দাঁড়ানো পিতার আবেদনে কান দেন না, আর এখনকার বাংলার একটি ক্ষুদ্র মডেল হয়ে ওঠে একটি হাসপাতাল।
বাংলার মানুষের বিরাট প্রাণশক্তি, নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে দৈনন্দিন সখ্যের সম্পর্ক, রোজগারের জন্য রাজ্যে  ও রাজ্যের বাইরে রুজি রুটির জন্য চেষ্টা, এসব সত্ত্বেও, শাসক দলের মনোযোগ পায় না তাদের ভবিষ্যৎ। সরকার টিকিয়ে রাখার আধুনিক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল ক্ষমতার কাছে রেখে দেয় স্থানীয় ধনী শ্রেণি। দরিদ্রের শোষণ, তোলা আদায় আর রাজ্যে্র সম্পদের তোলাবাজারি যাদের মূল অধ্যবসায়। এরা মানবতা বিরোধী, নির্মম, অর্থ লোলুপ এবং নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা দখল করা ছাড়া এদের কোনও উদ্দেশ্য নেই। যেহেতু প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি ও নির্বাচনে যে কোনও প্রকারে জয় ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তিনি সতত যুদ্ধের ভঙ্গিতে। সবাই তাঁর শত্রু। এবং এই মুঠি পাকানো হাতের চিৎকারের মধ্যো ভাবনা চিন্তা মনন কিছুই নেই। পশ্চিমবাংলার দুর্ভাগ্য, দীর্ঘ দিন অটো পাইলটে থাকা এই রাজ্যের কোনও ব্যবস্থাই কাজ করে না। এটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে তোলাবাজি আর দুর্নীতি সতত পুরস্কৃত, সেখানে আগ বাড়িয়ে নিজের কাজটুকু করার মধ্যে কোনও আকর্ষণ নেই। যে রাজ্যের সমাজবিরোধী থানায় বসে থাকে আর শিক্ষকেরা রাস্তায় পুলিশের লাথি ও লাঠি খায়, যেখানে গত দেড় দশকে কোনও কর্মসংস্থান হয়নি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা‍ ব্যবস্থা ধুলোয় লুণ্ঠিত, অথচ করদাতার অর্থে নির্মাণ হতে থাকে একের পর এক উপাসনা স্থল, সেখানে যে এসআইআর প্রক্রিয়া এমন কুটিল ও ভিন্ন রূপ নেবে, তা কি একেবারে অপ্রত্যাশিত?
কেন্দ্রীয় শাসক দল ও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করতে গিয়ে বিগত দেড় দশকে রাজ্যের বিশৃঙ্খল, প্রশাসনহীন অবস্থাকে কোনোভাবেই প্রশ্ন করছেন না, এমন বিশিষ্ট মানুষের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অন্তরে তাঁরাও গোপন করতে পারবেন না, প্রশাসনের যে একটি দৈনন্দিন বিশ্বাসযোগ্য চেহারা আছে বাংলায় তা আমরা ভুলতে বসেছি। তার সঙ্গে মিশে গেছে শাসক দল ও প্রধান বিরোধী দলের কিছু আঁতাত যার চেহারা জনমানসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশেষ সন্ধিক্ষণে। ঘৃণাপূর্ণ সাম্প্রদায়িকতা যেমন কেন্দ্রীয় শাসক দলের কবচ কুণ্ডল, কৌশলী সাম্প্রদায়িক নীতির ব্যবহারও রাজ্যের শাসক দলের অস্ত্র। যখন জগন্নাথ মন্দিরের উদ্ঘাটন হচ্ছিল, তখন ওয়াকফ বিল প্রতিরোধের আন্দোলনের অছিলায় সমাজবিরোধীরা পৌঁছে গিয়েছিল দূরবর্তী হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামের বিশাল গৃহদাহের ঘটনায়। সেদিনও পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আসেননি জনতার আকুল ডাকে। এবং এ ঘটনা কেবল নিছক সমাপতন নয়।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সকলেই প্রতিপক্ষ। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা চোখের সামনে দেখা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার এসআইআর’র বিরোধিতা করেননি। তাদের হাতে ছিল মন্ত্রীসভায় এর বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করানো, সামারি রিভিশনের দাবি করা। বরং প্রথম দিকে বিএলএ- দের নামিয়ে বিএলও- দের সহায়তা করার জন্য শিবির খোলার কাজও বড় মাপে করা হয়েছে। যখন বড় সংখ্যায় ভোটারদের নাম বাদ গেল, তখন সরকারের টনক নড়ল। বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ গেছেন সব রাজ্যে্ই। কারণ মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের অনুপাত দশ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বিচারাধীন কেসের সঙ্কট দেখা দিয়েছে কেবল বাংলায়।
পুরো পর্বে মনে হয়েছে এসআইআর’র মতো বিরাট ও জটিল প্রক্রিয়াতে প্রশাসন নিজের অফিসারদেরই বিশ্বাস করতে পারেননি। অফিসাররাও এত যান্ত্রিকভাবে নিজেরের দায়িত্ব পালন করেছেন যে যেসব ম্যাপিং হওয়া কেস তাঁরা নিজেরা সমাধান করতে পারতেন, তা চলে গেছে বিচারাধীন শ্রেণিতে। কিন্তু আমার মতে একটি সুশাসিত রাজ্যই নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবিশ্বাসকে এইভাবে উচ্চতম ন্যায়ালয়ের কাছে বার বার নিয়ে যেত না। বিচারকদের এই প্রক্রিয়ায় শামিল করার পরিণতি হলো নির্বাচন কমিশন তাদের যাবতীয় দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারল। প্রকরণ দীর্ঘ হয়ে গেল কারণ বিচারাধীন কেস ট্রাইব্যুনালে না গেলে তার সমাধান হবে না।
তাহলে কি এসআইআর, লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যাওয়া, আরও ৬১ লক্ষ বিচারাধীন হওয়া শাসক দল ও প্রধান বিরোধী দল দু’দলেরই গোপন মনোবাসনা? এক দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, অন্যদের ক্ষমতায় আসার জন্য। এমন সন্দেহ এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে এলে তাকে বিশ্লেষণ করাই প্রয়োজন। কারণ এই দু’দলের কেউই বাংলার মানুষের অধিকার ও নাগরিকত্বের দাবিতে বিশ্বাস করেন না।

Comments :0

Login to leave a comment