সংবিধান সংশোধন করে লোকসভার বর্তমান আসন সংখ্যা ৫৪৪ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করতে মোদীর নেতৃত্বে আরএসএস-বিজেপি’র সরকার শুধু মরিয়া নয় রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে দিকে এগচ্ছে, বিশেষ করে সিজেপি-কে সামনে রেখে দেশের আগামী প্রজন্ম তথা ছাত্র-যুব সমাজ যেভাবে রাস্তায় নেমে পড়েছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা সহ অনেক কিছু বদলে ফেলার জোরালো দাবি তুলেছে তাঁতে শাসক বিজেপি শুধু সিঁদুরে মেঘ দেখছে না, আগামী লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরার অনিশ্চয়তা প্রবলভাবে অনুভব করছে।
মনে রাখা দরকার ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতাও অর্জন করতে পারেনি। এমনকি এনডিএগতভাবেও সরকার গড়ার সংখ্যা ছুঁতে পারেনি। পরে অন্ধ্রে টিডিপি এবং বিহারের জেডি(ইউ) সমর্থন জোগাড় করে কোনোরকমে সরকার গড়তে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ সালে অভাবনীয় সাফল্যের পর মোদী-শাহদের আত্মবিশ্বাস এতটাই আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল যে ২০২৪ সালে তারা ৪০০ আসনে হেলায় জিতবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সংবিধানটাই বদলে দিয়ে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করবেন। ধর্ম নিরপেক্ষ এবং গণতন্ত্র ব্যাপারটাই সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করা হবে। ভারত হবে হিন্দুত্ববাদীদের একদলীয় অতিকেন্দ্রীকৃত স্বৈরশাসন ব্যবস্থা চালু হবে। তাদের ঘোষিত এক দেশ, এক ধর্ম, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক নেতা, এক নির্বাচন বলবৎ হবে দেশে। কিন্তু ভারতের জনগণ তাদের সেই আশায় ছাই দিয়ে তাদের আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশের কাছাকাছি নামিয়ে এনে সতর্ক করে দিয়েছেন। কিন্তু তারা যে সতর্ক হয়নি তা প্রতিদিন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের ঔদ্ধত্য ও অহঙ্কার থেকে। তাদের হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডাকেই তারা সংবিধানের বিরুদ্ধে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। দেশের সাধারণ গণতন্ত্র প্রিয়, অসাম্প্রদায়িক মানুষ মেনে নিতে পারছেন না। বিশেষ করে আধুনিক উন্নত বিশ্বের উদারবাদী মানবিক চেতনার নতুন প্রজন্ম যে হিন্দুত্ববাদীদের ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে যন্তর মন্তর তার প্রমাণ।
এই অবস্থায় মোদী-শাহরা নিশ্চিত ২০২৯ সালে তাদের ক্ষমতায় ফেরা কোনও অবস্থাতেই সম্ভব হবে না। অথচ ক্ষমতায় তাদের ফিরতেই হবে। সেজন্যই একটার পর একটা ছক আর কৌশল খুঁজে বার করছে। মহিলা সংরক্ষণ বিলের মোড়কে আসন পুনর্বিন্যাস বিল তারই অন্যতম। বিজেপি জানে তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান ভিত্তিভূমি হিন্দি বলয় বা গোবলয়। আর এই গোবলয়ে রয়েছে সবচেয়ে বেশি আসন। এখন জনসংখ্যার বিচারে আসন বাড়লেও সর্বাধিক বাড়বে উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, গুজরাট, বিহার ইত্যাদি রাজ্যে। কারণ অশিক্ষা, অন্ধবিশ্বাসের দাপটে এই সব রাজ্যে জনসংখ্যা বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। তেমনি দক্ষিণ ভারত ও পূর্ব ভারতে জনসংখ্যা বেড়েছে নিয়ন্ত্রিত হারে। ফলে বিজেপি’র দুর্বল জায়গায় আসন কম বাড়বে কিন্তু শক্ত ঘাঁটিতে বাড়বে অনেক বেশি। এখন আসন পুনর্বিন্যাস করে ফেলা গেলে ২০১৯-র নির্বাচনে হিন্দি বলয়ের অতিরিক্ত আসনের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাওয়া সহজ হয়ে যাবে। দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে ধর্মান্ধ গোবলয়। এই চালাকিটা মানুষ ধরে ফেলেছে বুঝতে পেরে একে মহিলা সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে কেউ বিরোধিতা করতে না পারে। অথচ মহিলা বিল পাশ হয়ে গেছে ২০২৩ সালে। সেটা ইচ্ছা করে কার্যকর করা হয়নি। কারণ তাতে বিজেপি’র ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থ সিদ্ধি হবে না।
EDITORIAL
মহা সঙ্কটে বিজেপি
×
Comments :0