সম্পূরক আচার্য
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে পালা বদলের পর নবগঠিত বিজেপি সরকারের ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত রূপায়নে ঘোষিত পদক্ষেপগুলি রাজ্যবাসীর নজর কেড়েছে। তৃণমূল সরকার যেভাবে পয়লা বৈশাখ ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করতো তা যে নতুন আমলে বন্ধ হবে তার আভাস ছিল। তৃণমূল সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উদযাপন শুরু করেছিল মুখ্যমন্ত্রীর স্বভাবসুলভ বাণী বিতরণের নতুন একটা মঞ্চ সাজাতে।
বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করে আসছিল। চলতি বছরে তাতে সরকারী সিলমোহর পড়তে চলেছে। আগে যা ছিল দলীয়, এবছর থেকে তা সরকারী!
১৯৪৭ সালের ২০ জুন অবিভক্ত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির বৈঠকে বাংলা বিভক্তির ঘোষিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সমর্থিত হয়। সেই ২০ জুন তারিখটিকেই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিজেপি’র মৌলিক রাজনৈতিক অবস্থানটি স্পষ্টতর হয়। ’২০ জুন’ শুধু একটি তারিখ নয়, তা একটি রাজনৈতিক অবস্থান।
২০ জুন কেন?
অনেকের ধারণা, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ২০ জুন তারিখেই বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতে বাংলা-ভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বাস্তবে বিষয়টি ঠিক এরকম নয়। লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির ২০ জুন বৈঠকের একটি প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক পশ্চাদপট ছিল। সেই পশ্চাদপটের পর্দা উঠে সাতচল্লিশের ৩ জুন; যেদিন ব্রিটিশ গভর্ণর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা(রোয়েদাদ) ঘোষণা করেন। মাউন্টব্যাটন রোয়েদাদেই প্রথম স্পষ্ট করা হয় যে, ক্ষমতার হস্তান্তর হবে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ ভাগ করে। তার আগে, এমনকি ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনাতেও,বাংলাভাগের বিষয়টি অনেকটা উহ্য ছিল।
৩ জুনের রোয়েদাদ সেদিনকার পরিস্থিতিতে দেশভাগ-বিরোধীরাও মেনে নিতে কার্যত বাধ্য হয়েছিল। মুসলিম লিগ তো দেশ ভাগ চেয়েই ছিল; কিন্তু কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের মতো যারা দেশভাগের বিরোধী ছিল তারাও দেশভাগ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৫ জুনের দিল্লি বৈঠকে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ১৫৭-২৯ ভোটে ভাইসরয়ের পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়। আসলে দেশ ভাগ তথা বাংলা ভাগ ১৯৪৭ সালের ৩ জুনেই হয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেসের আগে বড়লাটের প্রস্তাবে সম্মতি দেয় মুসলিম লিগ।
গেরুয়া রাজনীতি এবং বাংলাভাগ
বাংলাভাগ তথা দেশভাগ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলিক মর্মবস্তুর বিরোধী। জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের কাছেই দেশভাগ কাম্য ছিল না। অবিভক্ত ভারতই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্য।
অন্যদিকে, দেশভাগ চেয়েছিল সাম্প্রদায়িক শক্তি--মুসলমান ও হিন্দু উভয় পক্ষেরই। মুসলিম লিগ ভারত-ভেঙে পাকিস্তান গঠন করতে চেয়েছিল সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যপূরণে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পিছনে ছিল দ্বিজাতি তত্ব। যে তত্ব অনুসারে, হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি; যাদের নাকি এক দেশে একত্রে বাস অসম্ভব!
বলাবাহুল্য, স্বাধীনতার প্রাক্কালে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, অন্যান্য বামপন্থী দল—কেউই দেশভাগ তথা বাংলা ভাগের পক্ষে ছিলেন না। ‘হিন্দু-হোমল্যান্ড’ হিসেবে ভারত কিংবা পশ্চিমবঙ্গ এবং ‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ হিসেবে পাকিস্তান কিংবা পূর্ব বাংলা গঠন তাঁদের লক্ষ্য ছিল না। গান্ধীজীও আমৃত্যু দ্বিজাতি তত্বের বিরোধিতা করেছেন।
অন্যদিক, বাংলাভাগ ও দেশভাগের পক্ষে ছিল গেরুয়া রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই। বিশেষত,বাংলায় ১৯৪৬ সালের কলকাতা ও নোয়াখালি দাঙ্গার পর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নজিরবিহীনভাবে তিক্ত হয়ে উঠে। হিন্দু মহাসভা ‘হিন্দু’ বাঙালীদের জন্য পৃথক প্রদেশের দাবি তুলতে থাকে। প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে ১৬ মার্চ (১৯৪৭) কলকাতার ভারত সভা হলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে হিন্দু বাঙালীর জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে ‘জনমত’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বলেন,পৃথক হিন্দু প্রদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য সর্বপ্রকার সুবিধা দেওয়া হবে এবং পূর্ব বঙ্গের হিন্দুদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হবে। সভায় বঙ্গবিভাগের প্রস্তাব উত্থাপন করেন নির্মলচন্দ্র চ্যাটার্জি। (যুগান্তর, ১৭ মার্চ ১৯৪৭)
বাংলা ভাগের দাবিতে হিন্দু মহাসভা ১৯৪৭ সালের ৪-৬ এপ্রিল হুগলির তারকেশ্বরেও প্রাদেশিক সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানেও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বাংলাকে দু’ভাগ করার দাবিতে সোচ্চার হন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪৭ সালের ১১ মে সর্দার প্যাটেলকে লেখা চিঠিতে দাবি তোলেন, ‘‘পাকিস্তান হোক বা না হোক,বাংলা প্রদেশ ভেঙ্গে দু’টি প্রদেশ করতে হবে।’’ (দুর্গা দাস সম্পাদিত, সর্দার প্যাটেলস করসপন্ডেন্স, ভলিউম –চার, পৃষ্ঠা ৪০)
ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তৎকালীন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতে তাঁর দল হিন্দু মহাসভার একমাত্র সদস্য ছিলেন। একমাত্র এম এল এ থাকায় স্পষ্ট, মহাসভার জনসমর্থন বিশেষ ছিল না। যদিও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ও অবস্থানের জন্য ড. মুখার্জির সামাজিক প্রভাব মর্যাদা ও পরিচিতি ছিল। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে হিন্দু মহাসভার সক্রিয়তা বেড়ে যায়। মহাসভা সমর্থকরা সেই সময়ই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে বাঙালী ‘হিন্দু’-র ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরে। এখনও বিজেপি সদস্য সমর্থকরা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সেই ভূমিকার কথাই তুলে ধরছেন।
তবে সেকালে কংগ্রেসপন্থী জাতীয়তাবাদীদের একাংশ কখনও কখনও ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বিভিন্ন কর্মসূচীর সঙ্গী হয়েছিলেন। যদিও তাঁরা হিন্দু মহাসভা বা সঙ্ঘ পরিবারের দেশ ভাবনার সঙ্গে সর্বতোভাবে সহমত ছিলেন না। তাঁরা সাধারনভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতান্ত্রিক ভারতের ভাবনার সঙ্গেই একাত্ম বোধ করতেন। কমিউনিস্ট পার্টিও ১৯৪৬-৪৭ সালের বিতর্কের আগে পাকিস্তান দাবি সংক্রান্ত ‘গঙ্গাধর অধিকারী থিসিস’ (১৯৪২)-র অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল মে-মাসে সংযুক্ত সার্বভৌম বঙ্গ প্রদেশ গঠনের পক্ষেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুখ্যত প্রাদেশিক স্তরে কংগ্রেস এবং লিগের কয়েকজন নেতৃত্ব এই উদ্যোগের সামনের সারিতে ছিলেন। যদিও শেষপর্যন্ত কংগ্রেসএবং লিগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই প্রস্তাবে সমর্থন দেন নি। উদ্যোগটি থিতিয়ে যায়।
গেরুয়াপন্থীরা কী বলে?
আজ স্বাধীনতার প্রাপ্তির প্রায় আট দশকের মুখে ২০ জুন পালন করতে গিয়ে গেরুয়াপন্থীরা আসলে বাংলা ভাগের পক্ষে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, হিন্দু মহাসভা ও তৎকালীন সংঘ পরিবারের সক্রিয় ভূমিকার উদযাপন চায়। তাদের দাবি,ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিই নাকি পশ্চিমবাংলার ‘জনক’-- বাংলাভাগের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ‘গঠনের’ জন্য ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কাছে নাকি হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তারা দাবি করে, ২০ জুন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতে বাংলাভাগ নিয়ে সদস্যদের ভোটাভুটিতে জ্যোতি বসুসহ কমিউনিস্ট সদস্যরাও নাকি ড. মুখার্জির পথকেই অনুসরণ করেছিলেন।ইত্যাদি ইত্যাদি। বলাবাহুল্য এসব নেহাতই অপব্যাখ্যা। প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন।
অ্যাসেমব্লিতে ২০ জুন
মাউন্টব্যাটন রোয়েদাদ অনুযায়ী আহূত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির ২০ জুনের বৈঠকে মুখ্যত বাংলাভাগ এবং বাংলার গণপরিষদে যোগদানের প্রশ্নে সভার সদস্যদের মতামত নথিভুক্ত করা হয়। ভোটাভুটি মানে সেটাই। সভায় কেউ ভাষণ দেননি। আইনসভার প্রচলিত অধিবেশনেররীতির সঙ্গে ২০ জুনের বৈঠকের অমিল নজর এড়ায় না।
প্রসঙ্গত, তখনকার ২৫০ সদস্য বিশিষ্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতেসভায় ( ১৯৪৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল অনুযায়ী)প্রধান শক্তিশালী দল ছিল—১১৩ আসনে জয়ী মুসলিম লিগ এবং ৮৬ আসনে জয়ী জাতীয় কংগ্রেস। সি পি আই-র ছিল ৩টি আসন- জ্যোতি বসু (রেল ট্রেড ইউনিয়ন), রতনলাল ব্রাহ্মণ (দার্জিলিঙ) এবং রূপনারায়ন রায় (দিনাজপুর)। হিন্দু মহাসভার এক জন। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। জয়লাভ করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসন থেকে। তখন কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন করে নির্বাচিত হতেন।সেইসঙ্গে ছিলেন ইউরোপীয় সদস্য ২৫ জন, এবং নির্দলীয় মুসলিম ও নির্দলীয় হিন্দু সদস্য।
প্রাদেশিক রাজনীতিতে মূল ভূমিকা ছিল কংগ্রেস ও লিগের। লিগের পক্ষে ছিল মুসলিম জনতার প্রায় সর্বাত্মক সমর্থন। মাত্র একজন সদস্য নিয়ে হিন্দু মহাসভা বাংলা অ্যাসেব্লিতে ২০ জুন নির্ধারক ভূমিকায় ছিল, এই দাবি নেহাতই অতিকথন।
সিপিআই-র সাংগঠনিক সামর্থ্যও ছিল সীমিত। বিশেষত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যত বেড়েছে তত চাপ বেড়েছে সি পি আই-র কার্যকলাপের উপর।ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দু বা মুসলিম সম্প্রীতির নীতি থেকে সরে যাওয়া কমিউনিস্টদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
২০ জুন সকাল ১১টায় অ্যাসেমব্লির সদস্যরা তাৎপর্যপূর্ণভাবে দু’ভাগে অধিবেশনে অংশ গ্রহণ করেন। একভাগে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে (মুখ্যত পূর্ব বঙ্গ) নির্বাচিত সদস্যরা। অন্যভাগে অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি (মুখ্যত পশ্চিমবঙ্গ) থেকে নির্বাচিত সদস্যরা। ২৫ জন ইউরোপীয় সদস্য সভায় উপস্থিত ছিলেন না। (অমৃতবাজার পত্রিকা, এলাহাবাদ, ২১ জুন ১৯৪৭)।বোঝাই যায়, ২০ জুনের অধিবেশন বিধানসভার সাধারণ অধিবেশনের মতন ছিল না। কার্যত ভোটাভুটির আগেই কে কোন পক্ষে তা স্পষ্ট হয়ে যায়!
হিসেব অনুযায়ী, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে ১৪৫ জন নির্বাচিত সদস্যের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও উপস্থিত ছিলেন ১৪০জন। অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে ৮০জন নির্বাচিত সদস্যের উপস্থিত থাকার কথা ছিল, ৭৯ জন উপস্থিত ছিলেন।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত সদস্যদের অধিবেশন পরিচালনা করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নুরুল আমিন। আমিন ছিলেন অবিভক্ত আইনসভার স্পিকার। অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত সদস্যদের অধিবেশন পরিচালনা করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব। তিনি স্পিকার ছিলেন না। সভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ভোটাভুটিতে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাসেব্লির সচিব কে আলি আফজল।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলির নির্বাচিত সদস্যদের অধিবেশনে কংগ্রেস পরিষদীয় দল নেতা কিরণ শঙ্কর রায় (ইস্টবেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল আসন থেকে নির্বাচিত) প্রস্তাব দেন যৌথ অধিবেশনের। সভাপতি এই প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং ঘোষণা করেন, বিকাল তিনটায় অ্যাসেমব্লির দুই অংশের যৌথ বৈঠক (জয়েন্ট মিটিং) বসবে। কংগ্রেস এবং লিগ পরস্পরবিরোধী অবস্থান সত্বেও যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেয় দুপক্ষ।
বিকাল তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত বেঙ্গল লেজিসলেটি অ্যাসেমব্লির যৌথ অধিবেশনে নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে ২১৯ জন সদস্য অংশ নেন। সেখানো ভোট গ্রহণ হয় বর্তমান কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লি (১৯৪৬ সালের নভেম্বরে গঠিত ভারতীয় গণপরিষদ) না পৃথক কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে (পাকিস্তান গণপরিষদ গঠিত ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট ) বাংলা প্রদেশ যোগ দেবে; সেই প্রশ্নে। সভার ৯০ জন সদস্য ভোট দেন বর্তমান কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে যোগ দেবার পক্ষে। নতুন পৃথক কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে (পাকিস্তান গণপরিষদ) যোগ দানের পক্ষে ভোট দেন ১২৬ জন। ২১৯ জনের মধ্যে ভোট দেন ২১৬ জন ভোটে অংশ গ্রহণ করেন। ফলাফল যে এরকমই হবে তা দুপক্ষই জানতেন। তিন কমিউনিস্ট সদস্য যৌথ অধিবেশনে সি পি আই ভোটদানে বিরত থাকে।
কমিউনিস্ট পার্টির দাবি ছিল, কোনো প্রদেশ বা প্রদেশের অংশ ভারত না পাকিস্তান কোথায় অন্তর্ভূক্ত হবে তা গণভোটে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু মাউন্টব্যাটন রোয়েদাদে গণভোটের সুযোগ নেই। সীমাবব্ধ ভোটাধিকারের (মাত্র ১৪ শতাংশ) ভিত্তিতে গঠিত আইনসভায় তা চূড়ান্ত করা অসঙ্গত। কমিউনিস্ট পার্টি চায় নি অখন্ড বাংলা প্রদেশ পাকিস্তানে যোগ দিক।
যৌথ অধিবেশন শেষ হলে আবার বসে পৃথক অধিবেশন। বিকাল ৩-৩৫ মিনিটে। পশ্চিমবঙ্গের (অর্থাৎ, অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ) জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত বিধায়কদের অধিবেশনে বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট পড়ে ৫৮। ভাগের বিপক্ষে ভোট পড়ে ২১জন।
প্রত্যাশিতভাবেই মুসলিম লিগ সদস্যরা বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন। কংগ্রেস এবং দু’জন কমিউনিস্ট সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। হিন্দু মহাসভা সদস্যও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। তৎকালীন সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে যে কেউ দেখবেন, আইনসভায় হিন্দু মহাসভার ভূমিকা নিয়ে বিশেষ উল্লেখ নেই বললেই চলে।
পূর্ব বঙ্গীয় (অর্থাৎ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ) অংশের বিধায়কদের অধিবেশনে বাংলা ভাগের সমর্থনে আনা প্রস্তাব ১০৬-৩৫ ভোটে অগ্রাহ্য হয়। বলাবাহুল্য, মুসলিম লিগ সদস্যরা ভোট দেন বাংলা ভাগের বিরোধিতা করে। আর কংগ্রেসের ৩৪ জন সদস্য এবং কমিউনিস্ট সদস্য ( রূপনারায়ন রায় ) প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
ভোটগ্রহণ হয় কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে যোগ দানের প্রশ্নেও। পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় গণপরিষদে যুক্ত হবে এই মতের পক্ষে ভোট পড়ে ৫৮। ২১ জন ভোট দেন পাকিস্তান গণপরিষদে যোগ দেবার পক্ষে। পশ্চিমবঙ্গীয় অংশ থেকে নির্বাচিত বিধায়কদের অধিবেশনে দুই কমিউনিস্ট সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
পূর্ব বঙ্গীয় অংশের নির্বাচিত বিধায়কদের অধিবেশনে বর্তমান ভারতীয় গণপরিষদে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব ১০৭-৩৪ ভোটে অগ্রাহ্য হয়। কংগ্রেসের ৩৪ জন সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। ৫৫ জন তপশীলী সদস্য এবং কমিউনিস্ট সদস্য রূপনারায়ন রায় প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। বঙ্গ প্রদেশ যদি পূর্ব বঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গে বিভক্তই হয় তাহলে পূর্ববঙ্গে যে পাকিস্তানে থাকবে তা তো সব পক্ষ ৩ জুনের পরই মেনে নিয়েছিল।
মাউন্টব্যাটন রোয়েদাদ অনুযায়ী, পূর্ব বঙ্গের (অর্থাৎ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ) জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত বিধায়কদের অধিবেশনে সিলেটের পূর্ব বঙ্গে অন্তর্ভূক্তির প্রশ্নেও ভোট হয়। সিলেট নিয়ে গণভোট হলে প্রস্তাবিত পূর্ব বঙ্গ প্রদেশ সিলেটকে অন্তর্ভূক্ত করায় সম্মত হবে কিনা এই প্রশ্নে সদস্যদের ভোট নেওয়া হয়। অন্তর্ভূক্তির পক্ষে ভোট পড়ে ১০৫টি। বিপক্ষে ৩৪টি।
দেশবিভাগ প্রশ্নে জ্যোতি বসু তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে লিখে গেছেন-‘পার্টি দেশবিভাগের বিরোধিতা করেছিল- কিন্তু এর প্রতিরোধ করার মতো শক্তি ও প্রভাব পার্টির ছিল না.’ (তথ্যসূত্রঃ 'যত দূর মনে পড়ে';লেখক জ্যোতি বসু; পৃষ্ঠা ৪৫; প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ১৯৯৮) ২০ জুনের ভোটাভুটি সম্পর্কে কমিউনিস্ট এম এল এ’দের বিবৃতিতে বলা হয়: ‘আইন সভার ভোটাভুটি যেন বাংলার গৃহযুদ্ধে ইন্ধন না যোগায়’ এবং ‘দুই বাংলার মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাই বাঙ্গালী জাতির ভবিষ্যৎ’।
কট্টর বামবিরোধীদের কেউ কেউ বলে থাকেন, ২০ জুন অ্যাসেব্লিতে জ্যোতি বসুসহ কমিউনিস্ট সদস্যরা নাকি পার্টির সিদ্ধান্ত না মেনে ভোটাভুটিতে অবস্থান ঠিক করেন। বলাবাহুল্য, এবক্তব্যের সঙ্গে সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই।
অখন্ড বনাম খন্ডিত বাংলা
বেঙ্গল লেজিসলেটি অ্যাসেমব্লির ২০ জুনের ভোটাভুটি থেকে আপাতভাবে মনে হতেই পারে যে, যারা পাকিস্তান চেয়েছিল সেই মুসলিম লিগ ভোট দেয়অখন্ড বাংলা প্রদেশের পক্ষে। মুসলিম লিগ বাংলা প্রদেশের ভৌগলিক অখন্ডতার পক্ষে থাকার অর্থ, তারা চেয়েছিলঅখন্ড বাংলা প্রদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে আত্মসাৎ করতে। লিগের এই ধারণায় কোনো গণতান্ত্রিক মর্মবস্তু ছিল না। অখন্ড বাংলায় তারা চেয়েছিল খন্ডিত সমাজ।
হিন্দু মহাসভা এবং কমিউনিস্ট পার্টি/ জাতীয় কংগ্রেস ভোটাভুটিতে বাংলা ভাগের পক্ষে আপাতভাবে সম-অবস্থান নেয় মনে হলেও, প্রকৃত অর্থে তারা ছিল ভিন্ন মেরুতে অবস্থানকারী। গুণগতভাবে দুটি ভিন্ন অবস্থান থেকেই তারা সেদিন বাংলা ভাগের পক্ষে মত দেয়।
গেরুয়া রাজনীতিওছিল দ্বিজাতি-তত্ব-তাড়িত। কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাতীয় কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় দ্বিজাতি তত্বের সম্পূর্ণ বিরোধী অবস্থান থেকে। অখন্ড বাংলা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হোক—তারা চায়নি। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক কর্মসূচী থেকে বাংলা প্রদেশকে রক্ষা করতেই কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাতীয় কংগ্রেস বাংলা ভাগে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়।
‘হিন্দুত্ব’বাদীরা এবং লিগপন্থীরা ছাড়া আর সকলেই খন্ডিত পশ্চিমবঙ্গকে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের অংশ হিসেবে চেয়েছিল; তথাকথিত ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’ হিসেবে নয়।‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ হিসেবে পূর্ব বঙ্গ গড়ে উঠুক এও তাদের কাঙ্খিত ছিল না। স্বাধীন ভারত আত্মপ্রকাশ করে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। লিগের নেতৃত্বে পাকিস্তান গড়ে উঠে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ হিসেবে। পরবর্তীতে পূর্ব-বঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের অভ্যুদয় লিগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নস্যাৎ করেই।
পশ্চিমবঙ্গ ভৌগলিকভাবে খন্ডিত হলেও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে তা স্বভাবতই হিন্দু মহাসভার ফর্মূলা মেনে হয়নি। স্বাধীনতার উষাকালে ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচী অধরা থেকে যায়। এতদিন পরে গেরুয়া রাজনীতি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে চাইছে।‘পশ্চিমবঙ্গ’ দিবস পালনের অজুহাতে তাই বাংলা-ভাগের উদযাপন!
বিভাজনের রাজনীতিকে চাঙ্গা রাখতেই এসব করা হচ্ছে। সত্যের সীমাহীন অপলাপ এই বিভাজনপ্রকল্পেরই অংশ। টেনে তোলা হচ্ছে ‘দ্বিজাতি তত্ব’-র ভূতকে!
দুর্ভাগ্যের বিষয়, এতদিন যা ছিল দলীয় কর্মসূচী, চলতি বছরে তা সমগ্র রাজ্যবাসীর ঘাড়ে চাপানো সরকারী হুকুমৎ। হুকুমনামা জারি হয়েছে, সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ২০জুন পালন করতে হবে সরকারী বয়ান অনুযায়ী। একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে ব্যক্তি নাগরিকের নিজস্ব বোধ ও বিশ্বাসের জগতে শাসক কি এতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে?
Comments :0