ফসলের ন্যায্য দাম নেই, তার ওপর প্রকৃতির রুদ্ররোষে বারবার নষ্ট হয়েছে শ্রমের ফসল। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে সরকারি উদাসীনতা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিলেন আরও এক অন্নদাতা। বৃহস্পতিবার সকালে ধূপগুড়ি ব্লকের গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের ভাণ্ডানি এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃতের নাম পরেশ সরকার(৫৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরেশ বাবুর নিজের জমির পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য। মূলত অন্যের জমি আধি নিয়েই তিনি হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন। কিন্তু গত অক্টোবরের জলঢাকা নদীর ভয়াবহ বন্যায় তাঁর বিঘার পর বিঘা ধান সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যায়। চাষের খরচের জন্য মহাজন ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা পাহাড়প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ওপর।
পরিবার ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরেও সরকারি স্তরে কোনও ক্ষতিপূরণ বা বিমার টাকা তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের সামান্য ভিটেটুকুতে ভেন্ডি এবং ভুট্টা চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টিতে সেই স্বপ্নও পচে নষ্ট হয়ে যায়। একদিকে ঋণের দায়ে মহাজনদের চাপ, অন্যদিকে আগামী দিনের অন্নাভাব— এই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়ি কাছে দইখাওয়া ব্রিজের পাশে একটি গাছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন তিনি।
এই মর্মান্তিক ঘটনা বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী নিরঞ্জন রায়ের বাড়ির পাশেই। খবর পেয়েই তিনি সকালেই পরেশ বাবুর বাড়িতে যান। মৃত কৃষকের শোকাতুর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এবং সরকারের চরম উদাসীনতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘‘পরেশ সরকারের এই মৃত্যু নিছক আত্মহত্যা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড। বর্তমান সরকারের ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্প যে স্রেফ বিজ্ঞাপনী চমক, তা এই ঘটনা ফের প্রমাণ করল। একদিকে সারের কালোবাজারি, অন্যদিকে ফসলের অভাবী বিক্রি কৃষকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে।’’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘গত বন্যার পর আমরা বারবার দাবি জানিয়েছিলাম প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকার ভিত্তিতে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকার উৎসব আর মেলায় ব্যস্ত, শ্রমজীবী মানুষের চোখের জল দেখার সময় তাদের নেই। বিমার টাকা পাচ্ছেন না কৃষকরা, আর কিষাণ মাণ্ডিগুলো ফড়েদের দখলে। আমরা অবিলম্বে মৃত কৃষকের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং কৃষিঋণ মকুবের দাবি জানাচ্ছি। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের লড়াই আরও তীব্র হবে।’’
এলাকার কৃষক মনি রায়, গোপাল রায়, সঞ্জয় সরকার, বৃন্দাবন মন্ডলরা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘সরকারি উদাসীনতাই কেড়ে নিল এক কর্মঠ মানুষের প্রাণ। ফসলের বিমা বা সরকারি ত্রাণের সুবিধা প্রকৃত কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। গরিব কৃষক মরছে, আর প্রশাসনের কোনও হেলদোল নেই।’’
পুলিশ মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠালেও, এলাকায় চাপা উত্তেজনা ও শোকের ছায়া বজায় রয়েছে। পরেশ সরকারের এই মৃত্যু উত্তরবঙ্গের কৃষি সংকটের সেই ভয়াল ছবিটাকেই ফের সামনে এনে দিল, যা আড়াল করতে চাইছে শাসক শিবির।
Comments :0