'Father' of Bengal

‘জনক’ সমাচার

সম্পাদকীয় বিভাগ

মমতা ব্যানার্জি কায়মনো-বাক্যে চেয়েছিলেন শিল্প-সাহিত্য শিক্ষা থেকে শুরু করে রাজনীতি প্রশাসন সহ সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় ধারণ করতে। সেই মতো তাঁর ভক্ত, অনুগত প্রসাদভোগীরা অবিরত তাঁর হয়ে জয়ধ্বনি দিয়েছে। তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হিসাবে মানুষের মনে গেঁথে দিতে কালঘাম ছুটিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রয়াসই এখন আবর্জনার স্তূপে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মনোবাঞ্ছা পূরণে প্রচার প্রোপাগান্ডা দিয়ে ইতিহাস তৈরি করা যায় না। ইতিহাস তৈরি হয় সমাজ প্রগতির নিজস্ব প্রবাহ থেকে। সত্য ও বাস্তবের ভিতে গড়ে ওঠা পরিবর্তনীয় ও অলঙ্ঘনীয় সেই ইতিহাস থেকে অনন্তকাল। বাকি সব ক্ষণিকের ঝড় তুলে এক সময় চিরবিলীন হয়ে যায় কালের আবর্জনায়।
আরএসএস এবং বিজেপি (অতীতের হিন্দু মহাসভা ‍‌ও জনসঙ্ঘ হয়ে) পশ্চিমবঙ্গের আদি ও অকৃত্রিম ভাগ্য বিধাতা হিসাবে শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এই প্রয়াস নিরলসভাবে চলছে সেই স্বাধীনতার কাল থেকে। এতকাল অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে শ্যামাপ্রসাদকে পশ্চিমবঙ্গের এক ও অদ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে আরএসএস-বি‍‌জেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের ছাতার তলায় থাকা বিভিন্ন সংগঠন ২০জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করত। এবার রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পর তাতে সরকারি শিলমোহর দিয়ে রাজ্যের সর্বত্র সমস্ত সরকারি, আধাসরকারি, সরকার নিয়ন্ত্রিত অফিস দপ্তর এবং স্কুল কলেজ বিশ্ব বিদ্যালয়ে মহাসমারোহে উদ্‌যাপনের হুলিয়া জারি হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম রাতেই বেড়াল মারার মতো ক্ষমতা এসে প্রথম ধাক্কাতেই রাজ্যবাসীকে জোর করে গেলাতে চাইছে আর সবই মিথ্যা, কেবল শ্যামাই সত্য। অতীতের তথ্য প্রমাণনির্ভর সব ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়ে মানুষকে এটাই বুঝিয়ে দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের জন্মদাতা শ্যামাপ্রসাদ। শ্যামাপ্রসাদ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের জন্মই হতো। চলে যেত পূর্ববঙ্গে তথা পূর্ব পাকিস্তানে অধুনা বাংলাদেশে। হিন্দু বাঙালির রক্ষাকর্তা হিসাবে তাই শ্যামাপ্রসাদকে পরমপূজ্য হিসাবে রাজ্যবাসীকে গ্রহণ করতে হবে। হিন্দু মননে সিঁধিয়ে দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গ এবং শ্যামাপ্রসাদ এক এবং অভিন্ন। তাহলে কি বাংলার বিপ্লবী যোদ্ধারা, স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুতোভয় বীর সেনানীরা, সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। তখন হিমালয়ে বসে তপস্যা করছিলেন? বাংলা নবজাগরণের মহরথীরা কি হাওয়ায় উবে গিয়েছিলেন?
আরএসএস’র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বঙ্গীয় অ্যাজেন্ডা হলো বাংলার আদি অন্ত সব ইতিহাসকে মুছে দিয়ে একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ আলোকিত ও উদ্ভাসিত করতে হবে। কারণ বাংলায় হিন্দুত্বের, মুসলিম বিরোধিতার, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঐতিহাসিক আইকন হিসাবে তারা শ্যামাপ্রসাদকে চায়। তাতে আগামীদিনে গেরুয়া রাজনীতির সুবিধা হয়।
এরজন্য অনিবার্যভাবে অসত্য, অর্ধসত্য ও বিকৃত সত্যের আশ্রয় নিতে হবে। হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর হিন্দুত্ববাদীদের আজন্ম ‍বৈশিষ্ট্যই হলো নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে পছন্দের মিথ্যার নির্মাণ। অসত্যকে আশ্রয় করে বিকৃত ইতিহাসকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করা। কিন্তু অসত্য, অর্ধসত্য ও বিকৃত ইতিহাস চিরকালই ক্ষণস্থায়ী। আজ নয় কাল মিথ্যার ইমারত হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বেই। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। সত্য ইতিহাসকে সাময়িক আড়াল করা গেলেও সেটা অক্ষয় অব্যয়। বাংলা বাংলাই থাকবে। সাম্প্রীতির বাংলা, সৌভ্রাতৃত্বের বাংলা, মানবতার বাংলা, ভালোবাসার বাংলা, উদার গণতান্ত্রিক চেতনার বাংলা। বাংলা কখনো হিন্দু বাংলা হবে না।

Comments :0

Login to leave a comment