উলট-পুরাণ চলছে দেশে। যাঁর ক্ষমা চাইবার কথা তিনি ক্ষমা চাইলেন না। উলটে যারা তাঁর এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে বা কুমন্তব্য করেছে তাঁদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন বলে বিবৃতি দিয়েছেন। সেটা আবার গোদি মিডিয়া তাঁর মহানুভবতা হিসাবে ব্যাপক প্রচার করেছে। নিট পরীক্ষা তথা প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলনে কোনও অংশগ্রহণকারীর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেবে না— এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে যন্তর মন্তরের দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ-অবস্থান প্রত্যাহার হলেও সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার করেনি। এই মর্মে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সরকার প্রতিশ্রুতি বদলে জানিয়েছে যাদের বিরুদ্ধে অতীত অপরাধের ইতিহাস আছে তাদের এফআইআর প্রত্যাহার হবে না। অর্থাৎ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সরকার কথা দিয়েও কথা রাখছেন না। মুখে যা বলা হচ্ছে এবং যা প্রচার করা হচ্ছে বাস্তবে করা হচ্ছে উল্টোটা।
প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা করার পরও তাঁর হিন্দুত্ববাদী অন্ধ অনুগত ভক্তরা, বিশেষ করে বিজেপি’র আইটি সেল আন্দোলনকারী বিশেষ করে মহিলা আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের নিশানা করে লাগাতার হুমকি, ভীতি প্রদর্শন করে চলেছে। এমনকি ধর্ষণ, আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে। অনলাইন হয়রানি চলছে দিনরাত। এমনটাই যদি চলতে থাকে পুলিশ যদি এদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নেয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা করার বিষয়টি লোক দেখানো রসিকতা হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা তখনই অর্থবহ হতে পারে যখন সব আন্দোলনকারী সত্যি সত্যি দুঃশ্চিন্তামুক্ত হতে পারে এই ভেবে যে তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হিংসা প্রচার ও হুমকি বন্ধ হবে। তার মানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা করে মহান সাজার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁর ক্ষমা প্রদর্শনকে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসন ও দলীয় বাহিনীকে নির্দেশ দেননি। একইভাবে পড়ুয়াদের আন্দোলন প্রত্যাহার করতে মন্ত্রীরা প্রতিশ্রুতি দিলেও পুলিশকে সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারীরা সরকারের প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করে আন্দোলন প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু সরকার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।
নয়ডার যে নাবালিকা ছাত্র কটুকথা পোস্ট করায় পুলিশ এফআইআর করেছে প্রধানমন্ত্রী তাকে ক্ষমা করেছেন। অথচ পুলিশ এফআইআর প্রত্যাহার করেনি। দু’বেলা পুলিশ তার বাড়ি গিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। পাশাপাশি অন্ধ ভক্তরা অনলাইন আক্রমণ যথারীতি চালিয়ে যাচ্ছে। মারার, ধর্ষনের হুমকি দিচ্ছে। ক্ষমা করার নামে এটা কেমন ধরনের আচরণ!
এদিকে সংসদ অভিযানের সময় এবং যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় পুলিশি অত্যাচার ও নিপীড়ন যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল তার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে নিন্দাও ধিক্কার ধ্বনি উঠেছে। সর্বোচ্চ আদালতের নজরেও রয়েছে বিষয়টি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এমন বর্বরতা সম্পূর্ণ নীতি বিরুদ্ধ। প্রতিবাদের অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। কোনও সরকার সেটা কাড়তে পারে না। বস্তুত প্রতিবাদের, বিরুদ্ধতার অধিকার কাড়তেই মোদী সরকারের পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী অতিমাত্রায় হিংস্রতার আশ্রয় নিয়েছে। এর বিরুদ্ধে বিরোধীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে দায় নিয়ে পদত্যাগ করার দাবি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাইবার দাবিও উঠেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা চাননি। তার অর্থ দেশের আগামী প্রজন্মের উপর এমন সরকারি হিংস্রতাকে তিনি মান্যতা দিচ্ছেন। তেমনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জবাব দেবার ভয়ে সংসদ এড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা সততা ও ন্যায়পরায়ণতার নিদর্শন নয়।
Editorial
ক্ষমা না রসিকতা
×
Comments :0