Left Resurrection

বাইনারি অতীত এবার বাম পুনরুত্থান

সম্পাদকীয় বিভাগ

প্রথম দফার ১৫২ আসনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বাকি ১৪২ আসনে, প্রচারও মোটামুটি শেষের মুখে। রাজ্য রাজনীতিতে গত প্রায় এক দশক ধরে তৃণমূল বনাম বিজেপি’র দ্বিদলীয় ভাষ্য জনমানসে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার যে পরিকল্পিত প্রয়াস চালানো হয়েছে সেটা লক্ষণীয়ভাবে এখন অনেকটাই ফিকে। সে জায়গায় তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে বামপন্থীদের প্রবলভাবে উঠে আসাটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমে এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা না গেলেও নির্বাচনী সংগ্রামের ময়দানে মানুষ নিজেরাই প্রত্যক্ষ করছেন লাল ঝান্ডাকে ‍‌ঘিরে উন্মাদনার আশ্চর্য ছবি। বিশেষ করে যৌবনের ঢল একাংশ মিডিয়াকেও বাধ্য করেছে ফিরে তাকাতে। অর্থাৎ তৃণমূলের বিরুদ্ধে একমাত্র বিজেপি লড়ছে এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে একমাত্র তৃণমূল লড়ছে এহেন চাপিয়ে দেওয়া ধারণা আর কল্কে পাচ্ছে না।
এই বাইনারির উৎস প্রোথিত আছে তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রাক্‌ স্বাধীনতা যুগ থেকেই বাংলা বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি। স্বাধীনতার পর থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একদিকে কংগ্রেস অন্যদিকে বামেরাই ছিল প্রধান শক্তি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে কংগ্রেস দুর্বল হতে থাকে। এই সময় কমিউনিস্ট তথা বাম বিরোধী শক্তি অনুভব করে বামপন্থীদের সরাতে কংগ্রেস সক্ষম নয়, চাই নতুন কোনও শক্তি। মূলত আরএসএস’র সহায়তায় কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় তৃণমূল। তারপর তৃণমূলকে ঘিরে জড়ো করানো হয় অতিবাম, অতি দক্ষিণ-সহ সমস্ত ধরনের বাম বিরোধী শক্তিকে। ২০১১ সালে বাম সরকারের পতনের পর নতুন শাসক জোটের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে ছিল যেভাবেই হোক বাংলা থেকে বামেদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। এই প্রয়াস তীব্রতর হয় ২০১৪ সালে কে‍ন্দ্রে আরএসএস-বিজেপি ক্ষমতা দখলের পর। তখন থেকে বামপন্থীদের অপ্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বহীন দেখানোর জন্য চালু হয় দ্বিদলীয় তত্ত্ব। ২০২১ সালে নিবধানসভায় বামফ্রন্ট শূন্য হয়ে যাবার পর সেটাকে সর্বজনীন করে তোলার চেষ্টা হয়।
আরএসএস’র পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃণমূল এবং বিজেপি একে অপরের বিরোধীপক্ষ হিসাবে নিজেদের দেখিয়ে বামপন্থীদের মুছে লেলার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির আড়ালে চাপ দিতে চেয়েছিল মানুষের জীবন-জীবিকার দাবিকে। কিন্তু বামপন্থীরা ধারাবাহিক ময়দানে লড়াই জারি রেখে সেই ষড়যন্ত্রকে অনেকটাই ভেস্তে দিয়েছে। তাই এই নির্বাচনে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে বামপন্থীদের।
পরিস্থিতির বাস্তবতা আজ বুঝিয়ে দিচ্ছে শূন্যের গণ্ডি পেরিয়ে বামেরা বড়সড় সংখ্যায় জয়ী হতে যাচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারছেন তৃণমূলকে হটানো বিজেপি’র লক্ষ্য নয়। বিজেপি-ও চায় না তৃণমূলকে সরাতে। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে চায় যেভাবেই হোক বামপন্থীদের ঠেকাতে। তাই আজ যে তৃণমূল কাল সে বিজেপি। আজ যে বিজেপি তো কাল হয়ে যায় তৃণমূল। আসলে বিজেপি যতদিন বাংলায় নিজের শক্তিতে ক্ষমতায় আসতে না পারছে ততদিন বামপন্থীদের আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে । আর যদি কোনও দলই ক্ষমতা দখলের সংখ্যা না পায় তাহলে দু’দল মিলে বা এক দল থেকে অন্য দলে গিয়ে সরকার গঠন করতে চাইবে। এইসব ভণ্ডামি মানুষের কাছে যত বেশি স্পষ্ট হচ্ছে তত বেশি বেশি মানুষ বামদিকে ঝুঁকছে। একটা সময় বাইনারির বিভ্রান্তিতে বাম সমর্থকদের একাংশ তৃণমূলের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেতে বিজেপি’র পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এবার সেই ভোট অনেকটা ফিরতে চলেছে। ফলে বামেরা প্রচারে, মিছিলে, জনসভায় মানুষের ঢল নেমেছে। বামপন্থীদের পুনরুত্থানের জয়যাত্রা শুরু এই নির্বাচন থেকেই।

Comments :0

Login to leave a comment