VI Lenin

লেনিন— আপসহীন বিপ্লবী ও আজীবন সংগ্রামী

সম্পাদকীয় বিভাগ


শ্রীদীপ ভট্টাচার্য
আজ কমরেড লেনিনের ১৫৭তম জন্মদিবস। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামের অসামান্য নেতা কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। পুঁজিবাদী শোষণ ও আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে সর্বহারার রাষ্ট্র তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক বিপ্লবী নেতা কমরেড লেনিন। মার্কসবাদকে অবলম্বন করে সর্বহারার বিপ্লবী সংগ্রামের প্রথম সফল রূপকার ভ্লাদিমির লেনিন। তত্ত্ব ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারাই প্রকৃত বিপ্লবীর বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যের সেরা নিদর্শন কমরেড লেনিন। লেনিনের সমগ্র বিপ্লবী জীবন হলো তত্ত্ব ও কর্মের মধ্যে অসাধারণ সমন্বয়। একদিকে মার্কসীয় মতবাদকে নতুন পরিস্থিতিতে সমৃদ্ধ করার ঐতিহাসিক কর্তব্য তিনি পালন করলেন। অপরদিকে, পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের স্তরে উন্নীত হলো, সেই যুগে, এমনকি পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশেও সর্বহারা বিপ্লব সম্ভব, বাস্তবে তিনি তা রুশ দেশে সর্বহারার বিপ্লব সফল করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করলেন।
মার্কসবাদ—  প্রয়োগের মতবাদ
মতবাদ, দর্শন সম্পর্কে মার্কসের বোঝাপড়া স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় তাঁরই রচনা থেকে। ‘ফয়েরবাখ সম্পর্কিত থিসিস’-এর একাদশ থিসিসে মার্কস বলেছেন, ‘‘দার্শনিকরা এতকাল ধরে নানাভাবে বিশ্বকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু মূল কথা হলো একে পরিবর্তিত করা।’’ অর্থাৎ শুধুমাত্র বিমূর্ত চিন্তা নয়, দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো দুনিয়া তথা মানব জীবনের পরিবর্তন তথা উন্নতি। দ্বান্দ্বিকতা (Dialecties)-কে ভাববাদ থেকে মুক্ত করে বস্তুবাদের সঙ্গে যুক্ত করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠা মার্কস-এঙ্গেলস’এর ঐতিহাসিক অবদান।
লেনিন যখন মার্কসবাদের প্রয়োগের সংগ্রামে লিপ্ত সেই সময়ে ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ বিশ্ব পুঁজিবাদের শিবিরের তরফ থেকে আক্রমণের শিকার। দর্শনের নানা শিবিরের নামে বিজ্ঞানের অগ্রগতির অপব্যাখ্যা করে দ্বান্দ্বিকতাকে নস্যাৎ করার ব্যাপক চেষ্টা হয়েছিল। মার্কসীয় দর্শন তথা দ্বান্দ্বিকতাকে রক্ষা করার সংগ্রামে লেনিন যথাযথ নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করলেন। ‘এম্পিরিও ক্রিটিসিজিস’-এর নামে মাখপন্থীদের আক্রমণ মোকাবিলায় লেনিন ‘মেটেরিয়ানিজম অ্যান্ড এম্পিরিও ক্রিটিসিজম’ গ্রন্থটি রচনা করেন।
দ্বান্দ্বিকতার দর্শনকে মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবীর বিষয় নয়, সাধারণ মানুষের বোধগম্য করলেন। ‘নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণই দ্বান্দ্বিকতার মর্মবস্তু।’ (Concrete study of the concrete situation is the essence of dialectics.)।
অর্থাৎ বিরাজমান নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারাই দ্বান্দ্বিকতা। মহান দার্শনিক হেগেল শেষ পর্যন্ত ভাববাদে উপনীত হলেও দার্শনিক হেগেলকে লেনিন বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন তাঁর দ্বান্দ্বিক দর্শন প্রতিষ্ঠার ভূমিকার জন্য।
প্রকৃত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী হিসাবে লেনিন কোনও কিছুকে অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচনা করতেন না। সমস্ত কিছু গতির মধ্য দিয়ে পরিবর্তন ও বিকাশের ধারায় অবস্থান করছে। দ্বান্দ্বিকতাকে অবলম্বন করেই তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিশ্লেষণ করেছিলেন।
সাম্রাজ্যবাদ— পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়
মার্কস ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর (যথাক্রমে ১৮৮৩ ও ১৮৯৫) বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ ও তার বিকাশকে সঠিকভাবে বিচার ও বিশ্লেষণ করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলেন লেনিন। বিকাশের ধারায় প্রথম যুগের প্রতিযো‍‌গিতামূলক পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্তরই হলো সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করে লেনিন ৫টি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করলেন। প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো— জাতীয় অর্থনৈতিক জীবনে সর্বক্ষেত্রে একচেটিয়াদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। সাম্রাজ্যবাদের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো লগ্নিপুঁজি-ব্যাঙ্কপুঁজি ও শিল্পপুঁজির মিলনে যা গড়ে উঠেছে। আরও বাজারের সন্ধানে ব্যাকুল লগ্নিপুঁজি— যার অভিব্যক্তি ঘটে পরদেশ দখল ও লুণ্ঠনে সাম্রাজ্যবাদের কার্যধারায়।
সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে বিশ্বের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পূর্ণ হলেও পরস্পরের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। নতুন বাজার দখলের প্রয়াসেই এই সংঘাত বা যুদ্ধ। লেনিন দেখিয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদের যুগে যুদ্ধ অনিবার্য। ১৯৪৫ পর্যন্ত বিশ্বের ঘটনাধারা এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণকে সঠিক প্রমাণিত করেছে। যদিও ১৯৪৫-এর পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ পর্যন্ত বিশ্ব পুঁজিবাদের সমৃদ্ধির সময় (Boom period)। ১৯৭০-এর দশকে ‘বিশ্ব তেল সঙ্কট’-কে ঘিরে লগ্নিপুঁজির অকল্পনীয় ঘনীভবন ও কেন্দ্রীভবন ঘটে। শুরু হয় বিশ্বায়নের যুগ। লগ্নিপুঁজি আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির রূপ পরিগ্রহ করে। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির ব্যাখ্যা লেনিনের লগ্নিপুঁজির ব্যাখ্যাকে ভিত্তি করেই সম্ভব হলো। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, একে ভিত্তি করে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলির উপর সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ বৃদ্ধি পেল (উদারনীতির পথ গ্রহণ করতে তাদের বাধ্য করা)। তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির যুগে সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও তা তুলনায় স্তিমিত। বিশ্বযুদ্ধের আকারে এই দ্বন্দ্ব ফেটে পড়ছে না। যদিও আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বর্তমান সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ, প্যালেস্তাইন ও ইরানের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে।
বিপ্লবী সংগ্রাম ও পার্টি
পুঁজিবাদ সৃষ্ট সমগ্র সঙ্কট (সমাজ ও সভ্যতার সর্বক্ষেত্রে) সমাধানের একমাত্র উপায় পুঁজিবাদের অবসান। সর্বহারার নেতৃত্বে বিপ্লবই পুঁজিবাদের অবসান ঘটাতে সক্ষম। এই বিপ্লবের সংগঠক হলো সর্বহারার বিপ্লবী পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি। সেই পার্টি এক নতুন ধরনের পার্টি। শ্রমিক সহ সমাজের অন্যান্য অং‍‌শের থেকে সদস্য গ্রহণ করেই গড়ে উঠবে এই পার্টি। মার্কসবাদী মতাদর্শে পরিচালিত হবে এই পার্টি। বৌদ্ধিক দক্ষতায় ও শ্রেণি সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় পরিস্থিতির মূল্যায়নের ক্ষমতা থাকবে এই পার্টির। সর্বহারা তথা শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামর্থ্যকে সঠিকভাবে নিরূপণ করতে সক্ষম হবে এই পার্টি। এমনই পার্টি কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে রুশ দেশে গড়ে উঠেছিল। তার ফলেই ১৯০৫-এর ব্যর্থ বিপ্লবের শিক্ষা নিয়ে, স্টলিপিন প্রতিক্রিয়াকে মোকাবিলা করেই নভেম্বর বিপ্লব সফল করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল বলশেভিক পার্টি (রুশ কমিউনিস্ট পার্টি)।
অসম্ভব নমনীয়তা সম্পন্ন এবং পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণে সক্ষম পার্টির পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী অবরোধের মধ্যেও একটিমাত্র দেশে সমাজতন্ত্র নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছিল। মার্কসীয় মতবাদ ও দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্বকে অবলম্বন করেই অগ্রসর হয়েছিলেন কমরেড লেনিন ও রুশ কমিউনিস্ট পার্টি।
সর্বহারার বিপ্লবী সংগ্রাম আর বিপ্লবী পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন লেনিন। পূর্ণ সক্রিয় ও সক্ষম সদস্যদের নিয়ে গ‍‌ড়ে ওঠে এই পার্টি। শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মর্মবস্তুকে অবলম্বন করে এই বিপ্লবী পার্টি তার কার্যধারা পরিচালনা করে। যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলা করার দক্ষতা শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী পার্টির থাকা প্রয়োজন। শ্রমিক-কৃষক সহ সমস্ত অংশের মানুষের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেই অগ্রসর হতে হবে। দ্বান্দ্বিকতাকে ভিত্তি করেই অগ্রসর হতে হবে এই পার্টিকে। 
কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে লেনিনের মূল্যবান শিক্ষাকে অবলম্বন করে আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গুণগতভাবে উন্নত পার্টি সদস্য ব্যতিরেকে এরকম পার্টি গঠন করা সম্ভব নয়। পার্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ এবং মতাদর্শগতভাবে দৃঢ়, আপসহীন সংগ্রামী এভাবেই সমস্ত পার্টি সদস্যকে গড়ে উঠতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত করার জন্য সিপিআই(এম) গণলাইন সম্পন্ন বিপ্লবী পার্টি গঠন করার আহ্বান নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
লেনিনের শিক্ষাকে আত্মস্থ করেই অগ্রসর হতে হবে
বুর্জোয়া ব্যবস্থা তথা সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে যে ইতিবাচক উপাদানগুলি রয়েছে তাকেও শ্রেণি আন্দোলন ও গণসংগ্রামের লক্ষ্যে ব্যবহার করা সম্ভব এবং কমিউনিস্টদের তা করতে হবে— কমরেড লেনিনের শিক্ষা। এই শিক্ষাকে আত্মস্থ করেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
রণনীতিকে সামনে রেখে বিরাজমান পরিস্থিতিতে সম‍‌য়োপযোগী রণকৌশল গ্রহণ করেই কমিউনিস্টদের কার্যধারা পরিচালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কর্পোরেট ও হিন্দুত্বের মেলবন্ধনের শক্তি আরএসএস-বিজেপি’কে যেমন রুখে দিতে হবে, আবার একই সঙ্গে স্বৈরাচারী, দুর্নীতিবাজ ও চরম কমিউনিস্ট বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে হবে। রাজ্যের এই বিধানসভা নির্বাচনে এটাই রণকৌশল।
রণনীতি ও রণকৌশলকে ভিত্তি করে যে সিদ্ধান্ত তার বাস্তবায়নে নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা চাই। এটা কমরেড লেনিনের মূল্যবান শিক্ষা। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস কমিউনিস্টদের থাকে। সেই সাহসে ভর করে সর্বহারা বিপ্লবের অসাধারণ নেতা কমরেড ভি আই লেনিনের শিক্ষা আত্মস্থ করেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে যথার্থ ভূমিকা গ্রহণ করতে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
মতাদর্শের প্রশ্নে আপসহীন ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে অকুতোভয় কমরেড লেনিনের জন্মদিনে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
 

Comments :0

Login to leave a comment