বিধানসভা নির্বাচনের আবহে উন্নয়নের খতিয়ান দেওয়ার বদলে ফের পুরনো ‘টোটকা’তেই ভরসা রাখলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার ময়নাগুড়ি টাউন ক্লাব ময়দানে তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে আয়োজিত সভায় তাঁর বক্তব্যে উন্নয়নের চেয়েও বেশি স্থান পেল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং এনআরসি’র পুরনো জুজু। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাহাড় থেকে সমতল—উত্তরবঙ্গে পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়াতেই ফের মেরুকরণ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছেন তিনি।
হেলিকপ্টারে চড়ে নামলেন। হেলিপ্যাড থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বাতাবাড়ি সেন্ট লাকি চার্চ এ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে করলেন বৈঠক। চালসার অদূরে অবস্থিত বিলাসবহুল হোটেলে করলেন রাত্রিবাস। এদিন দুপুরে চালসার বেসরকারি হোটেল থেকে সড়কপথে মুখ্যমন্ত্রী সোজা চলে আসলেন মালবাজার মহকুমার মেটিলি আইটিআই কলেজের পাশে তৈরি করা অস্থায়ী হেলিপ্যাডে। সেখান থেকেই হেলিকপ্টারে ময়নাগুড়ির নির্বাচনী জনসভার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় বক্তব্য রাখলেন কিন্তু কথা বললেন না, মেটিলি ব্লকের তিনটি অঘোষিত বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে। মেটিলি ব্লকের সামসিং, নাগেশ্বরী, কিলকোট চা বাগান বন্ধ। তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাথে চা বাগানের শ্রমিক প্রতিনিধিদের বন্ধ বাগান প্রসঙ্গে কথা বলবেন বলে।
এদিন সভার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে মোতায়েন করা কেন্দ্রীয় বাহিনীর উদ্দেশ্য কার্যত উস্কানিমূলক বার্তা দেন তিনি। তৃণমূল নেত্রীর হুঙ্কার,‘‘বিজেপির হয়ে কাজ করলে মা-বোনেরা উত্তর দেবে।’’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কায় কতটা বিচলিত শাসকদল। রাজনৈতিক মহলের মতে, পরাজয় নিশ্চিত জেনেই পরাজয়ের আগাম অজুহাত খাড়া করছেন নেত্রী। তৃণমূল জমানায় উত্তরবঙ্গে কর্মসংস্থান বা নতুন শিল্পের হাল যে শোচনীয়, তা এদিন তাঁর ভাষণেই স্পষ্ট। উন্নয়নের প্রশ্নে সদুত্তর না মেলায় ফের এনআরসি এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের নাম করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেন তিনি। ময়নাগুড়ির বাম প্রার্থী সুদেব রায়ের দাবি, নাগরিকত্বের ভয় দেখিয়ে ভোট আদায়ের এই কৌশল আদতে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা মাত্র। প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার পুরনো আতঙ্ক খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে যেখানে মানুষের প্রধান দাবি কাজ এবং স্থায়ী রোজগার?
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও স্বাস্থ্যসাথীর প্রচার। বামপন্থীদের অভিযোগ, স্থায়ী কর্মসংস্থানের বদলে যৎসামান্য ভাতার রাজনীতি করে মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এই সরকার। এমনকি এদিন সভার মঞ্চ থেকে বিহারের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের জেলা জুড়ে দেওয়ার মতো অবান্তর ও ভিত্তিহীন দাবি তুলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্থানীয় বাসিন্দার নিরঞ্জন অধিকারী ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘‘বিজেপি-তৃণমূলের এই তুই-তুকারি লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির কথা কোথাও নেই।’’ এদিনের সভায় ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। জল্পেশ মন্দিরের স্কাইওয়াক বা পানীয় জল প্রকল্পের মতো পুরনো প্রতিশ্রুতি বারবার ফেরি করা নিয়ে বাসিন্দারা বীতশ্রদ্ধ।
এদিন চা বাগান শ্রমিক নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা ও শ্রমিকদের সমস্যার নিয়ে একটি কথা না বলা প্রসঙ্গে তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জোসেফ মুন্ডা সাফাই,‘‘সময় কম থাকায় মুখ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠক হয়নি। তবে শ্রমিকদের দাবি পত্র গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন আচরণবিধি মিটলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।’’ বন্ধ চা বাগান প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর তরফে কোন সদর্থক পদক্ষেপ না হওয়ায় বিষয়টিতে সোচ্চার হয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। নাগরাকাটা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী দিলকুমার ওঁরাও জানিয়েছেন,‘‘ কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি ও তৃণমূলের শাসনকালে চা বাগান গুলিতে সমস্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাগান বন্ধ হওয়ায় রুজি রুটিতে টান পড়েছে। বাগান ছেড়ে বাইরে শ্রমিকের কাজ করতে চলে যাচ্ছেন এলাকার মানুষজন। সমস্যায় জর্জরিত সকলেই। কোন ভ্রুক্ষেপ নেই কেন্দ্র ও রাজ্যের উভয় শাসক দলের।’’
একদিকে তৃণমূলের হুমকি আর অন্যদিকে বিজেপির বিভাজনের রাজনীতি— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে উত্তরবঙ্গের মানুষ যে বিকল্পের সন্ধানে, তা এদিনের সভায় মানুষের মুখেই স্পষ্ট হয়েছে।
Mamata Banerjee
চা শ্রমিকদের সমস্যায় নিরুত্তর, ফের মেরুকরণের কৌশলেই মুখ্যমন্ত্রী
×
Comments :0