প্রযুক্তিগত গবেষণার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে নামমাত্র সুদে কোটি কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে মোদী সরকার। এই ঋণ কারা পাবে তা নির্ধারণে একটি কমিটি তৈরি করে কেন্দ্র। সিএজি’র সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রের এই ঋণ পেয়েছে এমন ৬২ শতাংশ সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি সরকারের তৈরি কমিটিরই সদস্য ছিলেন। কারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য, তা তাঁরাই ঠিক করেছেন। অর্থাৎ যাঁরা পরীক্ষা দিয়েছে, তাঁরাই পরীক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। গোটা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বেনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঋণ বাবদ সরকারের তহবিল থেকে দেওয়া ২১৯২ কোটি টাকা বেহিসাবী ভাবে খরচ করা হয়েছে বলে সরব হয়েছে বিভিন্ন মহল।
মোদী সরকারের ‘সুশাসনে’ একের পর এক আর্থিক বেনিয়ম এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রের তরফে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে প্রযুক্তিগত গবেষণায় উৎসাহ দিতে বিনা জামানতে ২.৭ শতাংশ সুদে ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিলির প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে প্রথম দফায় ২২টি বেসরকারি সংস্থাকে মোট ২১৯২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ বিলির জন্য বেসরকারি সংস্থা বাছাই প্রক্রিয়াতে দেদার বেনিয়ম চলেছে।
কারা এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য তা নির্বাচনে একটি কমিটি তৈরি হয়। দেখা গেছে, কমিটির সদস্যদের মালিকানাধীন সংস্থাগুলিই ঋণের সুবিধা পেয়েছে! অর্থাৎ ঋণ প্রাপক নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব হয়েছে। এতে ২১৯২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে মোট ১৫টি বেসরকারি সংস্থাকে মোট ঋণের ৬৬ শতাংশ হিসাবে ১৩৭৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এই ১৫ সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি সরকার নিযুক্ত প্যানেলের সদস্য।
দেশে গবেষণা পরিকাঠামো বাড়াতে মোদী সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক ১ লক্ষ কোটি টাকার একটি ‘রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট, ইনোভেশন ফান্ড’ তৈরি করে। এই তহবিলের অর্থ ঋণ আকারে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থাকে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
এই প্রকল্পের সুবিধা কারা পাবে, তা নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২টি সংস্থা তৈরি করে। এর মধ্যে একটি হল ‘টেকনলজি ডেভলপমেন্ট বোর্ড’ (টিডিবি)। তার অধীনে একটি ‘ইনভেস্টমেন্ট কমিটি’ গঠন করা হয়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছে, কমিটির ২২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র এক জন সরকারি প্রতিনিধি। তাঁর ভোটও দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বাকি ২১ জন সদস্য হলেন বিভিন্ন বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি। তার মধ্যে ১৫ জন সদস্য এমন সমস্ত সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি যারা এই সরকারি ঋণ প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী।
গত ৩০ জুলাই সাংসদ প্রবীণ চক্রবর্তীর প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং জানান, যেসব সংস্থা এই প্রকল্পে ঋণ পেয়েছে তাদের সঙ্গে কমিটির ৭ জন সদস্যের আর্থিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বোর্ডের যিনি চেয়ারম্যান তিনি অ্যাঞ্জেল ইনভেস্ট নেটওয়ার্ক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তাঁর সঙ্গে আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে এমন ৯টি সংস্থা ঋণ পেয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
কেন্দ্রের এই ঋণ প্রকল্পের জন্য ১২৪টি আবেদন জমা পড়ে। তার মধ্যে ২২টি সংস্থাকে যোগ্য বলে নির্বাচিত করা হয়। এই ‘যোগ্য’ ঋণ প্রাপক সংস্থাগুলির সঙ্গে বোর্ড সদস্যের আর্থিক স্বার্থ জড়িত বলে সিএজি রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি আবার কমিটিরও সদস্য, এমন ৭ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে রিপোর্টে। এর মধ্যে রয়েছেন— সৌরভ শ্রীবাস্তব (টিডিবি চেয়ারম্যান), ন্যাসোক্যাম’র প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থার বিশেষ শেয়ার হোল্ডার; কে আর এস জামওয়াল, টাটা গ্রুপের প্রাক্তন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত; গোপাল শ্রীনিবাসন, টিভিএস ক্যাপিট্যাল সংস্থার চেয়ারম্যান; সুধীর মেহতা, পিনাকল ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান; সঞ্জয় নায়েক, টেজার নেটওয়ার্ক সংস্থার সহ প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাক্তন সিইও; আনন্দ দেশপান্ডে, পারসিসটেন্ট সিসটেম সংস্থার চেয়ারম্যান; এবং দেবাশিস ভট্টাচার্য, লায়ন স্টেড সংস্থার ম্যানেজিং পার্টনার।
সাংসদ প্রবীণ চক্রবর্তী প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, কর্পোরেট কারবার এবং সরকারী প্রকল্পে অর্থ খরচের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। সরকারি প্রকল্পের অর্থ জনসাধারণের অর্থ। সেই অর্থ খরচে সব সময় স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়ায় তাই স্বচ্ছতা থাকা দরকার। এতে স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত কোন প্রশ্ন যাতে না ওঠে তা নজরে রাখা দরকার। কিন্তু ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-র প্রতিবেদন পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছে গোটা প্রক্রিয়াতেই গোড়ায় গলদ রয়েছে। যাঁরা ঋণের প্রাপক নির্বাচিত করবেন তারা নিজেরাই ঋণের প্রাপক সংস্থার মালিক বা প্রতিনিধি। কর্পোরেট মডেলে সরকারি প্রকল্পের রূপায়ন সম্ভব নয়। এতে দুর্নীতি বাসা বাঁধে। এই প্রকল্পের বেনিয়মেই তা পরিস্কার।
প্রসঙ্গত, সিএজি রিপোর্ট মোদী সরকারের ১৫টি মন্ত্রকে খরচের বেনিয়মের যে তথ্য ফাঁস করেছে তাতে সরকারের আর্থিক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা প্রকট হচ্ছে। সিএজি রিপোর্টে দেখা গেছে, কেন্দ্রের ১৫টি মন্ত্রকের বিভিন্ন প্রকল্পে ৫৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ খরচের কোনও হিসাব মেলেনি। কারণ তার ‘ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট’ বা অর্থ খরচের শংসাপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে নির্দিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ আদৌ খরচে হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিএজি। রিপোর্টে সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এবারে প্রযুক্তি গবেষণার খাতে অর্থ খরচে একই বেনিয়ম দেখা গেল।
Members of Government Panel cornered Loan
সরকারি কমিটির সদস্যরাই নিয়ে নিয়েছেন ৬৬% ঋণ!
×
Comments :0