রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জির মৃত্যুতে রহস্য দানা বাঁধছে। অন্তত কয়েকজনের বক্তব্যের পর সামনে আসছে একের পর এক ঘটনা। সোমবার ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে ফুসফুসে বালি জমার ফলে ফুসফুস অতিরিক্ত ফুলে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন এখানেই। কারণ রাহুল ব্যানার্জির মৃত্যুর পর সামনে আসে তিনি তলিয়ে যাওয়ার পর প্রায় দুই ঘন্টার বেশি সময় পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ ভগীরথ জানা নামে এক ব্যক্তি জানান তিনি নাকি দশ মিনিটের মধ্যেই উদ্ধার করেছেন। প্রথমত দশ মিনিট পর উদ্ধার হলে বাঁচানো সম্ভব হত অন্তত চিকিৎসক মহলের তাই মত। আর দ্বিতীয়ত প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রোডাকশন হাউসের বিভিন্ন ব্যক্তির কথা অনুযায়ী শুটিং চলাকালীন ওখানে কোন উদ্ধারকারী ও পুলিশ ছিলনা। দীর্ঘক্ষণ নিখোঁজ থাকার পর ইউনিটের সদস্যরাই উদ্ধার করে রাহুল ব্যানার্জিকে। তবে কি ভগিরথ জানা নামে ব্যক্তিকে সাজানো নাটক উপস্থাপনা করার জন্য সামনে আনা হল।
প্রসঙ্গত জানা গেছে শুটিং চলা অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে রাহুল ব্যানার্জির। কোনও নৌকা বা বোটের উপর উঠে শুটিং নয় জলে নেমেই শুটিং করছিলেন রাহুল ব্যানার্জি এবং সিরিয়ালের নায়িকা। সেই সময়ই জোয়ারের জলে বেসামাল হয়ে ভেসে যান দুজনেই। সঙ্গে সঙ্গে নায়িকাকে উদ্ধার করা গেলেও রাহুল ব্যানার্জিকে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধার করা যায়নি। অভিনেতার মৃত্যুর পর প্রোডাকশন হাউসের পক্ষে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় যে বিবৃতি রেখেছিলেন তা সত্যি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে হয়। তার কারণ তালসারিতে শুটিংয়ের যে সিডিউল ছিল তার মধ্যে সমুদ্রে নেমে শুটিং হবে এমনই তালিকায় ছিল। সেই মতোই শুটিং চলছিল এবং তা ড্রোন ক্যামেরায় ধরাও পড়েছে। পাশাপাশি প্রোডাকশন হাউসের ম্যানেজার এবং পরিচালকের কথাতেও মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও রাহুল ব্যানার্জির গাড়ির চালক এবং প্রোডাকশন হাউসের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের কথা অনুযায়ী ধারণা করা সম্ভব যে এটা সম্পূর্ণ গাফিলতি প্রোডাকশন হাউসের। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো তালসারির সমুদ্র বিচের ভৌগোলিক যা অবস্থান সেদিকে নজর দিলেই বোঝা যায় কতটা অপরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল এই প্রোডাকশন হাউসের। মূল সমুদ্র থেকে সমুদ্র বীচ এবং রাস্তা পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটারের দূরত্ব এর মাঝে বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকে এবং সেই জায়গা গুলি অত্যন্ত গভীর ও চোরাবালি সমৃদ্ধ হয়। জোয়ারের সময় জল বিচের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আসলে তখন বোঝার উপায় থাকে না কোথায় গভীরতা রয়েছে বা চোরাবালি রয়েছে। ফলে যখন শুটিং চলছিল সেই সময় ওই জমে থাকা জলের মধ্যেই নেমেছিলেন দুজনে। হঠাৎ জোয়ার আসার ফলে ওই গভীরতা থেকে উঠতে পারেননি অভিনেতা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন অনেকদিন ধরেই এখানে শুটিং চলছিল। ফলে আগে থেকে পুলিশ বা উদ্ধারকারী বাহিনীকে জানান দিলে তারা নির্দিষ্ট জায়গা শুটিং করার কাজে ব্যবহার করার কথা জানাতেন। অথচ এক্ষেত্রে পুলিশ বা উদ্ধারকারী দল কাউকেই রাখা হয়নি সমুদ্রের শুটিংয়ের সময়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায় এর আগে অনেক সিরিয়াল বা সিনেমার শুটিং তালসারিতে হয়েছে তখন কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন কে জানান দিয়েই বা তাদের অনুমতি নিয়েই শুটিংয়ের কাজ হয়েছিল। ইতিমধ্যেই উড়িশার পুলিশ জানিয়েছে এই শুটিং এর ক্ষেত্রে তাদের কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি।
ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেটা উড়িশা পুলিশের আওতায়। কিন্তু ময়নাতদন্ত থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে। একটি বর্ডার এলাকায় এমন শ্যুটিং হলে তা আগে থেকেই দুই রাজ্যের প্রশাসনকে জানান দেওয়া প্রয়োজন। অথচ তালসারি সবটাই উড়িশা রাজ্যের হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়নি। উড়িশার বালেশ্বর জেলার অন্তর্গত এই এলাকা। উড়িশা প্রশাসন ও পুলিশ উভয়ই বিবৃতি দিয়েছে তারা এমন শ্যুটিং এর বিষয়ে জানেই না। প্রশ্ন এখানেই।
অভিনেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মহম্মদ সেলিম।
ইতিমধ্যেই এরাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর পুলিশের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে রাহুল ব্যানার্জির ময়নাতদন্তের পর পরিবারের লোকেদের দেহ দেওয়া হয়। হাসপাতালের মর্গের সামনে কয়েকহাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন অভিনেতাকে শেষ দেখা দেখতে। বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংস্থা গুলির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সিপিআই(এম) পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পক্ষ থেকে অভিনেতার মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান অমল কুইলা, চন্দ্রশেখর পাঁজা সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এদিন রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জির বিজয়গড়ের বাড়ির সামনে উপচে পড়ে ভিড়। চোখের জলে শেষবার বিদায় জানাতে এসেছে প্রতিবেশীরা। ছিলেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, শমিক লাহিড়ী সহ নেতৃত্ব। ছিলেন আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যরাও। পাড়ার ছেলেকে শেষ দেখার জন্য প্রয়াত অভিনেতার বাড়ির সামনে ভিড় জমে যায়। ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে। এদিন কেওড়াতলায় অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে সেখানেও উপস্থিত পৌঁছে যান অভিনেতা প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, অঙ্কুশ হাজরা, পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি সহ অনেকে। প্রিয় অভিনেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এদিন কেওড়াতলায়ও উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। আন্তর্জাতিক গেয়ে তাঁকে বিদায় জানান বামপন্থী শিল্পী সহ বহু মানুষ।
Comments :0