অরিজিৎ মণ্ডল
এসএসকেএম’র জরুরি বিভাগের বাইরে ঘুরছিলেন তিন যুবক। তখন এক এক করে অ্যাম্বুল্যান্সে নিয়ে আসা হচ্ছে তারাতলার গোডাউনের শ্রমিকদের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের বাসিন্দা খালেক সর্দার গত এক মাস ধরে কাজ করছিলেন সেখানেই। তাঁর খোঁজ করছিলেন শ্যালক, নাম বললেন বাবুসোনা।
হাসপাতাল জুড়ে এমন ছবি বুধবার বিকেল থেকে দেখা গিয়েছে। কোথাও মৃত্যুর খবর পেয়ে ভেঙে পড়ছেন পরিজনেরা। আবার কেউ আত্মীয়ের খোঁজই পাননি। তারাতলার গোডাউন থেকে ঘরছেন হাসপাতালে।
প্রশাসনিক গাফিলতি তো বটেই। অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতিরও। তার জেরেই তারাতলায় বেস ব্রিজ সংলগ্ন গোডাউন ভেঙে পড়ে বিপর্যয় নেমে এসেছে একের পর এক পরিবারে।
বুধবার রাত পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আহত ২১ জনকে উদ্ধার করে আনা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। বাকি ১৭ জনের চিকিৎসা চলছে।
এসএসকেএম-এ খালেক সর্দারের আত্মীয়রা কথা বলছেন পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে।
কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা রাহুল চৌধুরী এই নির্মীয়মান গোডাউনে কাজ করছিলেন। তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁকে এসএসকেএম’র ট্রমা কেয়ারে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করে। পরিবার জানিয়েছে, গতকাল রাতেই তার সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের। ঘটনা জানতে পেরে তারা সরাসরি এসএসকেএম হাসপাতালে আসেন। অনেকক্ষণ ধরে খোঁজ করে পুলিশের থেকে জানতে পারেন মৃতদের মধ্যে রাহুল চৌধুরীর নাম রয়েছে।
ভাটপাড়া ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কৃষ্ণ চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন তারাতলার এই দুর্ঘটনায়। নির্মীয়মান এই বহুতলে জোগাড়ের কাজ করতেন তিনি। তাঁর পকেটে পরিচয়পত্র ছিল। টিভিতে খবর দেখে হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে জানতে পারেন আহত অবস্থায় ভর্তি এসএসকেএম-এ। হাসপাতালে এসে জানেন যে কৃষ্ণ চৌধুরী প্রয়াত। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেহ দেখতে দেওয়া হয়নি।
পরিবার জানিয়েছে টানা প্রায় ৬ মাস কাজ ছিল না কৃষ্ণের। এক মাস আগে এই গোডাউনে কাজ পান। চটকলের ছাঁটাই শ্রমিক তিনি।
দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গিয়েছে উদ্ধারকারী দলের কর্মীদের। দাঁড়িয়ে ছিল অ্যাম্বুল্যান্স। ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের কর্মীরা, বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা। মোতায়েন করা ছিল বিশাল সংখ্যায় পুলিশ বাহিনী। উদ্ধার কাজে দিয়েছে সেনাও। রাত পর্যন্ত চলছে উদ্ধারের কাজ।
এদিন দুপুরের দিকে নির্মীয়মান এই গোডাউন ভেঙে পড়ার পরই উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্থানীয় বহু মানুষ। তেমন একজন সোনু প্রসাদ জানালেন, ‘‘তিনটি তলাতেই গোডাউনে কাজ হয়। চা মজুত করা ছিল। কয়েকজনকে উদ্ধার করে আমরা বের করে আনি। তার মধ্যে এক মহিলাও ছিলেন। তবে ভেতরে অনেকে থাকতে পারে।’’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন ৫০-৬০ জন কর্মী ভেতরে কাজ করতেন। তাঁদের সকলের নথিভুক্তি ছিল কিনা স্পষ্ট নয়। নির্মীয়মান গোডাউনের অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের অনেকে। একাংশের অভিযোগ রয়েছে বিধায়ক এবং প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে নিয়ে। কলকাতা বন্দরের এই এলাকায় বহু গোডাউন দেখা গিয়েছে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। নির্মাণের অনুমতির ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাস্থলে যান রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীও। শুভেন্দু অধিকারী গিয়েছিলেন এসএসকেমএম হাসপাতালেও। তিনি সন্ধ্যায় ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত ৫। তার মধ্যে দু’জন আশঙ্কাজনক। বাকি ১৮ জনের প্রাণহানির আশঙ্কা নেই।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩১ জুলাই পর্যন্ত সব নির্মীয়মান গোডাউনের কাজ বন্ধ। এদের অনুমোদন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, তারাতলার এই গোডাউনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি।
রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেচে-৮৬৯৭৯৮১০৭০, ০৩৩২২১৪৩৫২৬, ০৩৩২২৫৩৫১৮৫।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে লেবার কন্ট্রাক্টরকে জেরা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন তা নির্দিষ্টভাবে জানার চেষ্টা হচ্ছে। মুখ্যসচিব উদ্ধারের বিষয়টি দেখছেন।
সিআইটিইউ’র দাবি, মৃত ও কর্মক্ষমতা হারানো সকল শ্রমিকদের পরিবারকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ও পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। এই মর্মান্তিক ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে গাফিলতির জন্য দায়ী সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাবস্থা করতে হবে।
Comments :0