গল্প
মুক্তধারা
-----------------------------
সে যখন শুকায়ে যায়
-----------------------------
ময়ূরী মিত্র
পর্ব -এক
রোহিত যেদিন মরল সে সন্ধেতে বৃষ্টির পর চাঁদ উঠেছিল কি ? একমাস বাদেও একই কথা ভেবে যাচ্ছিল অপর্ণা ৷ রোহিতের বাবা যখন টেলিফোনে একমাত্তর ছেলেটার মরার খবর দিলেন, কোনোমতে ফোনটা নামিয়েই ছুটে জানলার কাছে গিয়েছিল ৷ তীক্ষ্ণ চোখে বোঝার চেষ্টা করেছিল কোনটা বেশি সাদা ! বৃষ্টির ফোঁটা না মেঘের মাঝে উঠে পড়া চাঁদ ! আসলে একটা একেবারে বাচ্চা ছেলের মৃত্যু থেকে পালাতে যে কোনো একটা জানলা চেয়েছিল রোহিতের দিদিমণি ৷ চাইছিল প্রকৃতিকে ছুঁয়ে থাকতে ৷ প্রকৃতিতে তো অনেক জীব -অনেক উদ্ভিদ --অনেক তারা --অনেক বাতাস ! কোনোটা না কোনোটা প্রবাহিত হতেই থাকে ! জীবনের আশ্বাসটা বন্ধ হয় না ৷ বন্ধ ঘরে মৃত্যুর ঘুরে বেড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি -- শতকরা হিসেবে ৷ এমনটা ভেবেই রোহিতের মরার দিন থেকে জানলা খোঁজা অপর্ণার ৷ এই এখন যেমন ! রোহিতের কথা ভাববে বলে যখন ঠিক করেছে , মনে করে জানলাটা খুলে দিয়েছে অপর্ণা ৷
চুলে টান পড়তেই ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকাল ৷ এত বারণ করে তবু সুহাসিনী তাঁর পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী বউমার চুলে পনিটেল বাঁধবেনই ৷ আগে ছোট একবাটি সর্ষের তেল ভালো করে অপর্ণার চুলে মাখান ৷ তারপর লম্বা করে একটা ঘোড়ার লেজ ৷ বউয়ের চুলে পনিটেল দেখে সুহাসিনীর পঞ্চাশ বছরের ছেলের মুখে তৃপ্তি ফোটে ৷ সুহাসিনী হাসেন ৷ অপর্ণা রাগ করে --মা আমি কি বাচ্চা ? আপনি এমন করে চুল বাঁধেন ক্লাসের বাচ্চাগুলো হাসে ! তবু সুহাসিনী পনিটেল বাঁধবেনই আর অপর্ণা পনিটেল বেঁধে স্কুলে যাবেই ৷ মা হারা অপর্ণাকে এমন করেই বেঁধেছেন সুহাসিনী ৷ একটি নির্ভুল গানের মতো ৷
মৃত্যুর একমাস পরেও রোহিত যে অপর্ণার মন ছেড়ে যায়নি তার মূলেও পনিটেল ৷ প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকে অপর্ণার পিঠ বেয়ে উঠে পনিটেল খেতে শুরু করেছিল রোহিত ৷ খেতে এত ভালোবাসত --যা দেখবে তাই আগে খেয়ে দেখবে ৷ স্কুলের বিশেষ প্রশিক্ষক খুব যত্ন করে রোহিতের রোগ বুঝিয়েছিল অপর্ণাকে ৷ আর নিজের রোগের কথা শুনতে শুনতে অপর্ণার কোল থেবড়ে বসে পড়েছিল রোহিত ৷ আছছা --এগারো বছরের ছেলেটা কি তখন থেকেই বুঝতে পারছিল কিছুদিন পরেই চলে যাবে ও ! এত মন দিয়ে তবে কেন নিজের রোগের কথা শুনত রোহিত ! অপর্ণা লক্ষ্য করেছিল ,রোগের আলোচনা যখনই রোহিতের মায়ের সঙ্গে করত, রোহিত তখন মোটেই খেলতে যেত না ৷ দুজনের মাঝে বসে থাকত ৷থাকত তো থাকতই ৷
হলুদ হয়ে জন্মেছিল রোহিত ৷ হলুদ হয়েই মরেছিল ৷ অপর্ণা দেখেনি ৷ অন্য দিদিমণিদের থেকে শুনেছিল রোহিতের মরে যাওয়ার গল্প ৷ যতবার শুনেছে --অসহায়তায় টলটল করেছে ৷ রোহিত একই সঙ্গে জুভেনাইল ডায়াবেটিস ও অটিস্টিক ৷ অস্পষ্ট কথা কয় ৷ পা টেনে টেনে অপর্ণার চারপাশে চক্কর দেয় ৷ আর কোলে তুললেই পনিটেল মুখে ৷
সুহাসিনী পনিটেল বেঁধে উঠে গিয়েছেন ৷ খাটের ওপর সাজিয়ে রেখে গেছেন একটি তসর শাড়ি ও কালো ফুলহাতা ব্লাউজ ৷ অপর্ণার পছন্দের পোশাক ৷ কাল এগুলো পরেই গুরদোয়ারায় যাবে অপর্ণা ৷ কাল রোহিতের স্মরণসভা ৷ অপর্ণা ও সুহাসিনীর নেমন্তন্ন ৷
রোহিত খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করতে না পারলেও, বৌমার ফরমাশ মতো সুহাসিনী কত যে খাবার করে পাঠাতেন রোহিতকে ! সবসময় সরল হাসতে থাকা এই বাচ্চা পাঞ্জাব প্রদেশের যাবতীয় বিখ্যাত খাবারগুলো টিফিনে নিয়ে আসত ৷ অন্য বাচ্চা তার টিফিন কেড়ে খেত ৷ রোহিত থ মেরে দেখত --তার তড়কা , চানা বাটোরা পরমানুষ খাচ্ছে ৷ একটুও রাগ না করে ফাঁকা আঙুল চাটত বাচ্চাটা ৷ অপর্ণা বাড়ি এসে কাঁদত আর সুহাসিনী অপর্ণার টিফিনবাক্সের সঙ্গে আর একটি বাক্সে ভর্তি করে ছানার সাদা বড়া , পাটিসাপটা ,ক্ষীরের লুচি দিতেন ৷ একটার পর একটা গুছিয়ে খাইয়ে দিত অপর্ণা ৷ তার হাতে রোহিতের জিভ সুরসুর করত ৷ একদম কেঁচোর মতো লাগত বাচ্চা জিভের স্পর্শ ৷ বাড়ি এসে বলত --মা রোহিত তোমার মিষ্টিগুলোকে বলে white Moon ---ছেলেটা খেতে ভালোবাসে তো -- চোরের মতো লুকিয়ে তোমার খাবার খায় গো মা --পাছে এটাও যদি কেউ কেড়ে নেয় ! আছছা বল মা --খাবারের বিশেষণ কেউ white Moon বলে ৷ সুহাসিনী ভাবতেন --সত্যিই তো ! তাঁর তৈরী সবকটা মিষ্টি সাদা ৷
আগামী রবিবার সমাপ্ত
Comments :0