২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুথানে দেশে ছাড়েন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ঘটনার দুই বছর পর বুধবার নয়াদিল্লি থেকে অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিষয়ে কথা বলেন তিনি। ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আমাকে আমার দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আমাকে আমার দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, কিন্তু আমি আমার মানুষ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হইনি।’’ তিনি বলেছেন যে ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান। কিন্তু সরকার তাঁকে ঠেকাতে সবরকম চেষ্টা করবে।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব সাউথ এশিয়া’র উদ্যোগে এদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে স্যার মার্ক টুলি অডিটোরিয়ামে এই সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ভার্চুয়াল মাধ্যমে সেখান থেকেই বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘‘আমি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছি।’’ সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং সম্ভবত ডিসেম্বরেই। ভার্চুয়াল অডিও কনফারেন্সে শুধু তাঁর কণ্ঠই শোনা যাচ্ছিল। তিনি ক্যামেরার আড়ালে কথা বলেন। তাঁকে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শোনা গেছে, ‘‘গত দুই বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে ভুগতে দেখেছি। এটা সেই বাংলাদেশ নয় যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম, এটা সেই বাংলাদেশ নয় যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।’’ তিনি বলেছেন,‘‘জনগণের সমর্থন নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা পুনরায় এগিয়ে নেবেন। তাঁর এই ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, এ কর্মসূচি একটি বেসরকারি উদ্যোগ এবং এর সঙ্গে নয়াদিল্লির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’’
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময়কার হিংসার প্রসঙ্গে হাসিনা দাবি করেন, ‘‘আমি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের হিংসা নিয়ে সত্যি কথাই বলছি। এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। আমার সরকার শুরু থেকেই আলোচনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ছাত্রদের দাবিকে একটি হিংসার রাজনীতিতে পরিণত করার জন্য কাজ করছিল।’’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আজ আমি শুধু একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, জাতির পিতার কন্যা হিসেবে কথা বলছি। ৫ আগস্টের পর যে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল, তা অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে।’’ তিনি দাবি করে বলেন ‘‘কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এবং সাড়ে তিন হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। দশ লাখেরও বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা অভিযুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।’’
এদিনের বক্তব্যে হাসিনা বলেন, ‘‘১৯৭৫ সালে আমি আমার পরিবারকে হারিয়েছি। আমি ছয় বছর নির্বাসনে ছিলাম। দেশ ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি। আমার বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে।’’ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ ছাত্র সংগঠন যুব লীগের মহিলা কর্মীরা হেফাজতে নির্যাতন, অপমান ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। কারাগারে বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মী মারা গেছেন, যেখানে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার বা অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতন, চিকিৎসা না দেওয়ার বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যারা ধারণ করেন, তাদের কেউই নিরাপদ নন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মারকগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অসম্মান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভেঙে ফেলা হয়েছে।’’ প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে শেখ হাসিনা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাঁর সরকারের সময়কার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের মানুষ একদিন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং সেই জনগণের শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই তিনি আবার দেশে ফিরবেন। শেখ হাসিনা দাবি করেন, তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই ভাষণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নয়; এটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও সমর্থকদের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। দেশে ফিরে পুনরায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বলে মনে করছেন তাঁরা।
শেখ হাসিনার এই ভাষণের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা—এই তিনটি বিষয় এখন সমানভাবে আলোচনার কেন্দ্রে।
Sheikh Hasina
বাংলাদেশে ফিরতে চান, দিল্লি থেকে বললেন হাসিনা
×
Comments :0