বখতিয়ার আবিদ চৌধুরি: ঢাকা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মৌসুম চলছে। গ্রাম, শহর, পাড়া-মহল্লায় প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নিজ দলের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে নানা সমীকরণ মেলাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। এ ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এবারের ভোটের যা নতুন উপাদান হওয়ার কথা ছিল, সেই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ থেকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা ‘এনসিপি’ কার্যত ভোটের আলোচনায় বেশ পেছনেই রয়েছে। দলটি জামায়াতের ওপর ভর করে নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে চেষ্টা করছে। অথচ দলটির নেতৃত্বে থাকা এই তরুণেরাই অভ্যুত্থান পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে কার্যত নিয়ন্ত্রণকের ভূমিকায় ছিল। তারা যখন দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল—তার পর জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এনসিপি। তারপর সময় যত গড়িয়েছে নানা বিতর্কে জড়িয়েছে দলটির নেতা কর্মীরা। এই নির্বাচনে তাদের প্রাসঙ্গিক থাকা, না-থাকাও স্থির হবে।
গত বছর মার্চ মাসে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন–বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তানভীরকে দল থেকে সাময়িক অব্যহতি দেয় এনসিপি। এটা ছিল দল হিসাবে বড় কোনও বিতর্কে এনসিপি’র জড়িয়ে পড়ার ঘটনা। এ ছাড়াও দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা সারজিস আলম নিজ এলাকায় বিশাল গাড়ি বহর নিয়ে শোডাউন করা—আরেক শীর্ষ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ সহ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনসিপি’র নেতাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের খবর নিয়মিত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনাগুলি জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ফলে এনসিপি’র রাজনীতি বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
দলীয় নেতা কর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা যেমন এনসিপি’র রাজনীতিকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছিল, তেমনি তাদের ঘোষিত আদর্শ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার ঘটনাও এনসিপি-কে খাদের কিনারায় এনে ঠেকিয়েছে। দলটি যখন আত্মপ্রকাশ করে তখন তারা ‘ডান-বাম’ ধারাকে রাজনৈতিক বিভাজন হিসাবে দেখিয়ে—এর বিপরীতে ‘মধ্যপন্থী’ রাজনৈতিক আদর্শ এবং রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তনের ঘোষণা করেছিল। এনসিপি’র এই ‘নতুন’ রাজনীতির বার্তায় আকর্ষিত হয়ে ডানপন্থী, উদারপন্থী এমনকি বামপন্থীধারারও বহু নেতাকর্মী বিভিন্ন দল থেকে এনসিপিতে ভিড়ে যায়। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে নানা বিতর্কের পাশাপাশি দলটির কিছু শীর্ষ ও মাঝারি নেতার বক্তব্য ডানপন্থী রাজনীতিকে শক্তি জোগাতে থাকে। যার ফলে দলের ভেতর উদারপন্থী ও বামপন্থী অংশটি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে। গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামী সহ ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ আত্মপ্রকাশ করে। ইসলামী আন্দোলন শেষ মুহুর্তে সরে যাওয়ায় এটি ১০ দলের জোটে পরিণত হয়। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়ে। এ সময় বহু নেতা-কর্মী দলটি থেকে সরে যায়, যাদের একটি বড় অংশ মহিলা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতিতে দল হিসাবে টিকে থাকা কিংবা জোরালো অবস্থান তৈরি করতে যে পরিপক্বতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দূরদর্শীতার প্রয়োজন হয়—সেটি এনসিপি অর্জন করতে পারেনি। যে কারণে শুরু থেকেই দলটিকে ঘিরে নানা বিতর্ক রাজনীতির ময়দানে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নিয়ে গড়া দল এনসিপি’র রাজনীতি কেন দাঁড়াতে পারল না এবং কেন তাদের জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে হলো—এমন প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘ প্রথমত, ওরা গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তি হয়েও সরকারে যোগ দিয়েছে, বিষয়টি অনেকটা গতানুগতিক সরকারে যোগ দেওয়ার ঘটনার মতোই। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তারা ভুল করেছে। দল গঠনের পরই বাকি দলগুলোর শত্রুতে পরিণত হয় তারা। এই তরুণরা একটা ‘প্রেশারগ্রুপ’ হয়ে কাজ করতে পারত। এছাড়া একটা ডানপন্থী ‘নার্সিং’-এর মধ্য দিয়ে ওরা বেড়ে উঠেছে, ফলত ওদের আলটিমেট গন্তব্য ওখানেই ছিল।’
দল গঠনের সময় এবং পরের সময়টিকে বিবেচনায় নিলে আপাতদৃষ্টিতে ভোটের মাঠ বিবেচনায় এনসিপি’র রাজনীতি ‘অনেকটাই পিছিয়েছে’—এমন মন্তব্য অমূলক নয়। এখন তাদের টিকে থাকার লড়াই করছে। হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামি লিগের সরকারকে উৎখাত করতে যারা মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন, তাদেরই একটা অংশ এখনও এনসিপি’র নেতৃত্ব এবং এই নির্বাচনে প্রার্থী। কিন্তু বাস্তবটা হলো, যাদের জন্য একটা সরকারের পতন হলো এবং এখন ভোট হচ্ছে, তাদেরই এই নির্বাচনে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে লড়তে হচ্ছে।
Comments :0