ভাষ্কর দাশগুপ্ত
পুরুলিয়া জেলার জঙ্গলমহল এলাকার মহিলারা এখন কেমন আছেন? তাদের একটাই উত্তর যেমন ছিলেন তেমনি আছেন। অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশের গ্রাম আমকোঁচা। ৬৫ বছরের বৃদ্ধা মনি পাহাড়িয়া আজও দিনের আলো ভালো করে ফোটার আগেই জঙ্গলের পথ বেয়ে উঠে যান পাহাড়ের অনেকটা উপরে। সেখান থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে মাথায় চাপিয়ে নিয়ে আসেন বাড়িতে। তারপর সেই কাঠ আবার আঁকাবাঁকা বন্ধুর পথ পেরিয়ে সমতলের কোনও হাটে বিক্রি করেন। সেটা দিয়ে যতটুকু রোজগার হয় সেটা দিয়েই তার সংসার চলে। লক্ষীর ভান্ডার পাননি। স্বাস্থ্য সাথী ও পাননি। সেই বৃদ্ধার অকপট স্বীকারোক্তি ১৫ বছর ধরে এই সরকার তাদের জন্য কিছুই করেনি। আবার প্রতিবেশী গায়ত্রী পাহাড়িয়ার বক্তব্য এই সরকারের আমলে তারা কিছুই পাননি। রাস্তাঘাট আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। আগেও জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে এসে স্থানীয় হাটে বিক্রি করতেন। এখনও সেই একই আছে। তাদের লক্ষীর ভান্ডার নেই, স্বাস্থ্যসাথীও নেই।
বিকল্প রোজগারের কোনও উপায় না থাকায় কাঠ কাটার জীবিকা সম্বল করে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি, বান্দোয়ান, বলরামপুর, ঝালদা, কোটশিলা, মানবাজার এক ও মানবাজার দুই ব্লকের বহু মহিলাই তাদের সংসার চালাচ্ছেন। ২০১১ সালে পরিবর্তন হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন যে বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। ১০০ দিনের কাজ যখন ছিল তখন এদের মধ্যে অনেকেই সেই কাজ করতেন। কিন্তু সেই ১০০ দিনের কাজও বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার জঙ্গলমহল এলাকার মহিলাদের জীবিকার পরিবর্তন আনার জন্য বহু পরিকল্পনা নিয়েছেন। তাদের হয়তো অনেক গালভরা নামও আছে। কিন্তু কোন সরকারই সেগুলোর বাস্তবায়ন ঘটায়নি। বিকল্প রোজগারের ব্যবস্থা করেননি। যার ফলে মহিলাদের জীবিকাএবং জীবন সেই একই রয়ে গেছে।
শুধু আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ নয় অযোধ্যা পাহাড় সহ বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণ মহিলারা বিকল্প আয়ের কোন ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জঙ্গলের কাঠ মাথায় করে সমতলে নিয়ে এসে বিক্রি করেন। সাবিত্রী মাঝি, চম্পা হেমব্রম, সরলা হাঁসদা প্রমুখদের বক্তব্য শুধু পেটের টানে ভোর হতে না হতেই তারা দল বেঁধে অযোধ্যা পাহাড় সহ বিভিন্ন পাহাড়ের উপরে উঠে যান। তারপর চড়া রোদে মাথার উপর সেই কাঠের বোঝা চাপিয়ে নেমে আসেন। তারপর নিকটবর্তী কোন হাটে বিক্রি করে যতটুকু রোজগার হয় সেটুকুই তাদের সংসার চালানোর ভরসা। তাদের জীবিকা এই জঙ্গলের কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে এসে বিক্রি করা। বাম সরকারের আমলে বিভিন্ন এলাকায় মহিলাদের শাল পাতার থাল, বাটি প্রভৃতি তৈরি করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো বিক্রির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সে ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে গেছে। মহিলাদের বক্তব্য উৎপাদিত সামগ্রী কোথায় বিক্রি করবে সে ব্যবস্থা করেনি বর্তমান সরকার। স্বনির্ভর করার ও কোন চেষ্টা এই সরকারের আমলে দেখা যায়নি। তাই বাধ্য হয়ে কাঠ কাটাকেই সম্বল করে নিয়েছেন এই জেলার বহু মহিলার। সিরকাবাদের পথ বেয়ে মাথায় কাঠ নিয়ে নেমে আসা মহিলারদের ও বক্তব্য একই তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। আগেও ছিল জঙ্গলের কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে এসে বিক্রি করা। এখনও তাই রয়ে গেছে।
Comments :0