FIFA World Cup 2026

‘হু মেসি’ লেখা দর্শককে, জবাব দিলেন যাদুর স্পর্শে

খেলা বিশ্বকাপ ২০২৬

মেহতাব হোসেন

 

প্রত্যাশিতই ছিল আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে খুব বেশি গোল হবে না। লিওনেল মেসি জোড়া গোল করে ম্যাচ বের করে দিলেন। একটা ট্যাকটিক্যাল কঠিন ম্যাচ জিতে নিল গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। যা নকআউটের আগে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে হারাল অস্ট্রিয়াকে। ক্লিনশিট রেখেই ম্যাচটা জিতলো।   
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে লিওনেল মেসি জাদু দেখলাম। পুরো বিশ্ব দেখল! টিভি একজন মহিলা ভক্ত দেখলাম। যাঁর বয়স একশো। তিনিও ডালাস স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছেন মেসির জাদু দেখতে। অপেক্ষা করতে হলো ৩৮ মিনিট অবধি। বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলদাতা হয়ে গেলেন। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মিরোস্লাভ ক্লোজেকে স্পর্শ করলেন। একটা ম্যাচই লাগল ওঁকে পেরিয়ে যেত। বিশ্বকাপের মেসির গোলসংখ্যা এখন ১৮।  
‘মেসি জোন’ থেকেই বাঁ পায়ের সিগনেচার শটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। আরেকজন অস্ট্রিয়ার সমর্থককে দেখলাম, শরীরে ‘হু মেসি’ লিখে এসেছে। তাঁকে বার্তা দিয়ে দিলেন যে, আটত্রিশের মেসি এখনও ফারাক গড়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয় গোলটা অনবদ্য। ম্যাচের সংযুক্তি সময়ে প্রতি আক্রমণ থেকে হলো আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোল। মাঝমাঠে বল ধরে কিছুটা এগিয়ে বাঁ পায়ে বল বাড়ালেন জুলিয়েন আলভারেজকে। তাঁর শট বাধা পায়। বল পেয়ে যান লিয়ান্দ্রো পারাদেস। তিনি ফের বল দেন মেসিকে। লিওর শট বাধা পেলেও হাল ছাড়েননি। আরেকটু বক্সের ভেতর ঢুকে এসে দুরূহ কোণ থেকে তিন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে ২-০ করলেন মেসি। হ্যাটট্রিক হয়ে যেত! তাঁর মাটি ঘেঁষা শট পোস্টের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। 
প্রথম গোলটা টপ বক্সের মাথা থেকে। ওই জায়গা থেকে নিজের কেরিয়ারে অসংখ্য গোল করেছেন। মেসি ওখানে বল পেলে একশো বারের মধ্যে নিরানব্বই বার গোল করে দেবেন। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গোলটা দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে সান্তিয়াগো বার্না ব্যু’তে জর্ডি আলবার কাটব্যাক থেকে গোল করে গ্যালারির সামনে গিয়ে জার্সি দেখিয়েছিলেন। গোলটার আগে অবধি যতগুলি সুযোগ তৈরি হয়েছে, সবই মেসির পা থেকে।
মাঝমাঠে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সঙ্গে অস্ট্রিয়ার ফুটবলারের সংঘর্ষ হলেও অ্যালিস্টার বলটা বের করে নিয়ে মেসিকে দেন। মেসি ওই বলটা পাঠান বাঁ দিকে। ওখান থেকে মেসির উদ্দেশ্যে মাইনাসটা রাখেন মেদিনা। বক্সের মধ্যে এনজো ডামি দিলে বলটা পেয়ে যান মেসি। চলতি বলেই বাঁ পায়ের শটে পরাস্ত করলেন অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষককে। গোলের মুভটা শুরুর আগে অস্ট্রিয়ার ফুটবলার এবং তাঁদের কোচ ফাউলের আবেদন করেছিলেন। ওটা ৫০-৫০ ফাউল। কারণ দু’জনেই ডুয়েলে জড়িয়ে ছিলেন।   
যে পেনাল্টি মিস করেছেন, কিছুটা চাপে ভুগেই বলা যায়। সেটা ওঁর প্লেসমেন্ট দেখলেই বোঝা যায়। এদিন বলটা গোলেই রাখতে পারলেন না। গত বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে কিন্তু পেনাল্টি মিস করেছিলেন, সেটা গোলেই রেখেছিলেন। সেজনি বাঁচিয়ে দেন। এদিন বাইরে মারলেন, স্নায়ুচাপে ভুগে। যে ভুলটা করেছিলেন, প্রথমার্ধেই তার প্রায়শ্চিত্ত করে দিলেন। চলতি বিশ্বকাপে দু’ম্যাচে চার গোল হয়ে গেল।
অনেকেই বলতে পারেন, আর্জেন্টিনা এই দলটা মেসি নির্ভর। একেবারেই তা নয়। লাউতারো মার্টিনেজ আছেন। যে ভালো গোলস্কোরার। আর্জেন্টিনা যে পেনাল্টিটা পেল, সেটা লাউতারো আদায় করে দিলেন। অস্ট্রিয়ার দু’ডিফেন্ডার তাঁকে বাধা দিতে গিয়ে ফাউল করে ফেলেন। বেঞ্চে জুলিয়েল আলভারেজ আছেন। তিনিও গোল করতে পারেন। 
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা ভীষণ হিসেব কষে চলেছিল। তাড়াহুড়ো করছিল না। বিল্ড আপ স্লো হলেও, সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। প্রথমার্ধে অস্ট্রিয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা আর্জেন্টিনাই তৈরি করেছে মাঝমাঠে তিন-চারটি পাস খেলে, উইংয়ে বল ছড়িয়ে দিয়ে। তারপরই মেসির উদ্দেশ্য বল বাড়াচ্ছিল। মেসির পজিশনটা ফলস নাইন। বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখছিলেন সবসময়। ডিফেন্স থেকে আক্রমণে যাওয়ার আর্জেন্টিনার যে ট্রানজিশন, সেটা খুবই ভয়ঙ্কর যে কোনও দলের পক্ষে। ডি পল-এনজোরা বাড়তি লোড নিয়ে খেলেছেন। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হয়েও ডান প্রান্তে খেলে ডি পল নিজের একশো শতাংশ দিচ্ছিলেন। এই বহুমুখিতাই অন্য দলের চেয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিচ্ছে। 
এদিন আর্জেন্টিনার ডিফেন্স পরীক্ষার মুখে পড়েছে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোদের তৎপরতায় জন্য গোল হজম করেনি। লাইন অফ ফোর দারুণ ভাবে বজায় রেখেছে আর্জেন্টিনা।  অস্ট্রিয়া ভালো দল। দলগত ফুটবল খেলে। হাইপ্রেসিং করে বিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করে। প্রথমার্ধের কিছুটা সময় অস্ট্রিয়া দাপট দেখা যাচ্ছিল এভাবেই। আর্জেন্টিনার নিজেদের পাস খেলার স্পেস ব্লক করে হাইপ্রেস করে বল ছিনিয়ে আক্রমণ তৈরি করার চে্ষ্টা করেছে। তাতে ফ্রিকিক, কর্নার আদায় করেছে, গোলটাই পায়নি। সেটপিস থেকে নিঁখুত গোলের পাস বাড়াতে পারেনি। আর্জেন্টিনা ডিফেন্সিভ থার্ডেও বিপদ তৈরি করতে পারেনি।    
আর্জেন্টিনার একটা ভিশন রয়েছে। সেভাবেই খেলছে প্রতিটা ম্যাচ। বাকিদের থেকে অনেক অ্যাডভান্স লিওনেল স্কালোনির দলটা। দ্বিতীয়ার্ধে দু’দলই সুযোগ পেয়েছে। সেটপিস থেকে ফের এগিয়ে যেত পারত আর্জেন্টিনা। মেসির নিঁখুত বল আনমার্কড নিকো গঞ্জালেজ হেড ঠিক জায়গায় রাখতে পারলেন না। এরপরও একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করলেন লাউতারো মার্টিনেজের পরিবর্তে নামা নিকো। অস্ট্রিয়ার আর্নোউটোভিচ সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি ব্যর্থ হন সমতা ফেরাতে। মেসি একবার অফসাইডের ফাঁদে পড়লেন। বিরতির পর খেলাটা বড্ড ফিজিক্যাল হয়ে গিয়েছিল, যে কারণে লেফট ব্যাক মেদিনা হলুদ কার্ড দেখলেন। স্কালোনিও চতুর কোচ। জুলিয়েন আলভারেজ, লিয়ান্দ্রো পারাদেস ও ট্যাগলাফিকোকে গেম টাইম দিয়ে দেখে নিলেন। হয়তো গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আলভারেজ, পারাদেসদের প্রথম একাদশে দেখা যেতে পারে।
 

Comments :0

Login to leave a comment