নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁস মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) আদালতে যে চার্জশিট জমা দিয়েছে, তার ভিত্তি মূলত বিস্তৃত ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ। তদন্তকারীদের দাবি, পুনের একটি আবাসনের অ্যাক্সেস কন্ট্রোল অ্যাপের তথ্য, কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল ফোনের লোকেশন এবং উদ্ধার হওয়া নথিপত্র মিলিয়ে প্রশ্নফাঁস চক্রের কার্যকলাপের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
গত ২৮ জুলাই বিশেষ সিবিআই আদালতে ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে তদন্তকারি সংস্থা। তদন্তে উঠে এসেছে, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র রসায়ন বিশেষজ্ঞ এবং অভিযুক্ত পি. ভি. কুলকার্নি পুনের যে আবাসনে থাকতেন, সেখানে ব্যবহৃত অ্যাক্সেস কন্ট্রোল অ্যাপে বিশেষ কোচিংয়ে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের বায়োমেট্রিক তথ্য এবং প্রবেশ-প্রস্থানের রেকর্ড সংরক্ষিত ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরীক্ষার কয়েকদিন আগে ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের কুলকার্নির কাছে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি সিবিআইয়ের।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, কুলকার্নির পাশাপাশি এনটিএ-র প্রশ্নপ্রণয়ন প্যানেলের আরও দুই সদস্য জুলজি ও বোটানির বিশেষজ্ঞ মনীষা গুরুনাথ মান্ধারে এবং পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ মনীষা সঞ্জয় হাভালদার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ। সিবিআইয়ের দাবি, এনটিএ-র নিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তারা মোটা টাকার বিনিময়ে গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, বিউটিশিয়ান মনীষা সঞ্জয় ওয়াঘমারের সূত্র ধরেই গোটা চক্রের হদিস মেলে। অভিযোগ, ওয়াঘমার পুনে থেকে শুরু করে রাজস্থান ও হরিয়ানা পর্যন্ত একাধিক পরীক্ষার্থীর কাছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রশ্ন পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি কুলকার্নি ও মান্ধারের বিশেষ কোচিং ক্লাসে কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে ভর্তি করান এবং তাদের খাতা সংগ্রহ করেন। সেই খাতাগুলিতে বিশেষজ্ঞদের বলে দেওয়া প্রশ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত অংশ পাওয়া যায়।
সিবিআইয়ের দাবি, পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ হাভালদারও এই চক্রে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি মান্ধারের অনুরোধে এক পরীক্ষার্থীর মায়ের হাতে ১৬ পাতার একটি নথি তুলে দেন, যেখানে পদার্থবিদ্যার ৬৮টি সম্ভাব্য প্রশ্ন ছিল।
উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রশ্নপত্র, নোট এবং অন্যান্য নথি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়, উদ্ধার হওয়া প্রশ্নের একটি বড় অংশ নিট ইউজি ২০২৬-এর চারটি প্রশ্নসেট কৈলাস, শিবালিক, সেট-২ এবং সেট-৩-এর সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রায় মিলে যায়। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, যে প্রশ্নসেটগুলিতে অভিযুক্ত বিশেষজ্ঞদের প্রবেশাধিকার ছিল, সেগুলির সঙ্গে সর্বাধিক, প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মিল পাওয়া গিয়েছে। অন্য সেটগুলির ক্ষেত্রে মিলের হার ছিল অনেক কম।
চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র তৈরি, অনুবাদ এবং ব্যাক-ট্রান্সলেশনের কাজ দিল্লির ওখলায় এনটিএ-র দপ্তরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে হলেও সেখানে একাধিক প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অভিযুক্তরা হোটেলে ফিরে প্রশ্নগুলি পুনর্গঠন করতেন।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, কুলকার্নি খসড়া কাগজ ব্যবহার করে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও বিকল্প উত্তর ছোট ছোট চিরকুটে লিখে বাইরে নিয়ে যেতেন। সহজ প্রশ্নগুলি মুখস্থ করে প্রতিদিন হোটেলে ফিরে সেগুলি লিখতেন। তিনি নিট-ইউজি ২০২৬-এর তিনটি প্রশ্নসেটের ব্যাক-ট্রান্সলেশন করেছিলেন এবং উদ্ধার হওয়া রসায়নের প্রশ্নগুলির সঙ্গে সেগুলির সর্বাধিক মিল পাওয়া গিয়েছে।
অন্যদিকে, হাভালদার ও ওয়াঘমার মূলত প্রশ্ন গুলোকে মাথায় রেখে হোটেলে ফিরে নিজেদের বিষয়ভিত্তিক বইয়ে প্রশ্নগুলি লিখে রাখতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করতেন বলে অভিযোগ। মার্চ ও এপ্রিল মাসে এই কাজ তারা করেন। ফলে ৩ মে পরীক্ষার আগে পুনেতে ফিরে কোচিং চালানোর যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন। অথচ এনটিএ-র নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নপ্রণয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের ওই সময়ে কোচিং করানো নিষিদ্ধ।
এই মামলায় পুনের একটি কোচিং সেন্টারের মালিক শিবরাজ রঘুনাথ মুটগাঁওকরকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। সিবিআইয়ের অভিযোগ, তিনি এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কুলকার্নির কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে অর্থের বিনিময়ে নিজের কোচিং সেন্টারের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তা বিতরণ করেছিলেন।
তদন্ত এখনও চলছে। সিবিআইয়ের দাবি, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য, মোবাইল ফোনের অবস্থান বিশ্লেষণ, বায়োমেট্রিক রেকর্ড এবং উদ্ধার হওয়া নথিপত্র মিলিয়ে প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে।
NEET CBI
ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণেই নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁসের জাল উন্মোচন, চার্জশিটে বিস্ফোরক দাবি সিবিআইয়ের
×
Comments :0