Editorial

অতি ঔদ্ধত্য ভা‍‌লো নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

বিধানসভায় হিন্দুত্বের আগ্রাসী আধিপত্যবাদী কণ্ঠস্বর শোনা গেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মুখে। চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তিনি সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউ’র নাম পরিবর্তনকে বৈধতা দিয়ে বলেছেন বেশ করেছি। একই সঙ্গে হুঙ্কার দিয়েছেন সব নাম ও নিশান মুছে ফেলার। অর্থাৎ আধিপত্যবাদী ক্ষমতার দম্ভে বুঝিয়ে দিয়েছেন সোহরাবর্দি দিয়ে শুরু। ধীরে ধীরে মুসলিমদের সব নাম মুছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এটাও বলেছেন নিবেদিতা ছাড়া আর কোনও বিদেশির নামে রাজ্যে কোনও রাস্তা থাকবে না। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের পবিত্রভূমি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কোনও মুখ্যমন্ত্রী এভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও পক্ষপাতিত্বের কথা স্বগর্বে ও স্বদম্ভে করতে পারেন না। যে সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, দেড় মাস কাটতে না কাটতেই সেই সংবিধানকেই অস্বীকার করার মতো কথা বলছেন।
যে দিন সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউর নাম বদলে গোপাল মুখার্জি করার সিদ্ধান্ত কলকাতা কর্পোরেশনের তরফে ঘোষণা করা হয় সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী সোশাল মিডিয়ায় তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যুক্তি খাড়া করেন কলঙ্কিত ব্যক্তিকে সরিয়ে ইতিহাসকে মুক্ত করা হলো। অথচ যে সোহরাবর্দির নামে রাস্তা তিনি ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি বিশিষ্ট ডাক্তার, শিক্ষাবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য। মুখ্যমন্ত্রী এটা জানেন না তেমন অজ্ঞ সম্ভবত তিনি নন। তথাপি তিনি ইতিহাসের সত্যকে বিকৃত করে কুখ্যাত সোহরাবর্দি বলে চালিয়ে মুসলিম বিদ্বেষের হাওয়া গরম করতে চেয়েছেন। পরবর্তীকালে যখন চারদিক থেকে প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড় উঠতে থাকে তখনও তিনি নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেননি। উলটে নতুন করে উপাচার্য সোহরাবর্দিকেও আক্রমণের মুখে দাঁড় করিয়ে জানিয়ে দেন কোনও পাঠান, মোগলের নাম থাকবে না।
এর থেকে পরিষ্কার তারা সচেতনভাবেই উপাচার্য সোহরাবর্দির নাম ছেঁটে দিয়েছেন মুসলিমদের নাম মুছে দেবার লক্ষ্যে তাতে মানুষ অসন্তুষ্ট বা ক্ষুব্ধ হতে পারে এই ভয়ে সচেতনভাবে ইতিহাস বিকৃত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত সোহরাবর্দিকে টেনে এনেছেন। পরবর্তীকালে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন শুধু সোহরাবর্দি নন, কোনও মুসলিম নাম থাকবে না। এমনকি বিদেশি মনীষীর নামও মুছে দেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী কি ভেবে-চিন্তে এসব কথা বলেছেন নাকি হিন্দুত্বে অতি উগ্র ও আক্রাশ থেকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এমনও হতে পারে মুখ্যমন্ত্রীর গদি সুরক্ষিত রাখতে আরএসএস-কে খুশি করতে চাইছেন। আরএসএস থেকে বড় আরএসএস হতে চাইছেন।
সমস্ত মুসলিম ও বিদেশিদের নাম বাদ দিয়ে নতুন নামকরণের জন্য সরকার প্রদীপ্তানন্দের (কার্তিক মহারাজ) নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে। এ রাজ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তথা নাগরিক সমাজে সম্মানীয় ব্যক্তির অভাব পড়েছে। তাই খুঁজে খুঁজে হিন্দুত্ববাদী এক ধর্মগুরুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাম পরিবর্তনের তালিকা তৈরি করতে। আরএসএস’র হিন্দুত্ববাদী ধ্যান ধারণার সঙ্গে যুক্তদেরই তিনি তালিকায় লিপিবদ্ধ করবেন সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। তৃণ জমানায় চটিজীবীরা যেমন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এ জমানায় গেরুয়া সাধু সন্ন্যাসীরাই বিশিষ্টের তালিকায় জায়গা পাবেন।

Comments :0

Login to leave a comment