ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য যারা বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেলন না তারা কি পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন? কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে সর্বদলীয় বৈঠকে এই বিষয় কোন উত্তর নেই কমিশনের কাছে।
মঙ্গলবার আলিপুরের নব প্রশাসনিক ভবনে কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে সিপিআই(এম) বিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেস এবং মমতা তৃণমূলের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুব্রত দত্ত বলেন, ‘নিয়ম রক্ষার বৈঠক। আগে থেকে সব ঠিক করেই এসেছে কী বলতে হবে। ডিএম ছিলেন না, এডিএম তার নিজের কথা বলে উঠে চলে গেলেন।’ তিনি বলেন, ‘যেই ভোটার তালিকার মাধ্যমে ভোট চুরি করা হয়েছিল বিধানসভা নির্বাচনে সেই চুরি করা তালিকাতেই ভোট করতে চাইছে সরকার।’ তার অভিযোগ কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় যেই নাম গুলো বাদ গিয়েছিল সেই নাম গুলোকে বাদ রেখেই ভোট করতে চাইছে কমিশন। তিনি বলেন, ‘বিধানসভা নির্বাচনে যারা ভোট দিতে পারলেন না তারা কর্পোরেশন ভোটেও ভোট দিতে পারছেন না। মিথ্যা লোক দেখানো ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে।’ সিপিআই(এম) এর কথায়, কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিএলওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাম তুলবে যেই নাম গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই ভোটারদের কোন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না ভোট দেওয়ার। তাদের কথায় কোন গেজেট নোটিফিকেশন ছাড়া ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বিরোধীদের কোন অভিযোগ জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি।
সিপিআই(এম) এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বরো ভিত্তিক আধিকারিকদের নাম জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক দল গুলোর পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি ওই আধিকারিকের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। তার থেকেই খসড়া ভোটার তালিকা, বুথের তালিকা এবং ভোট কেন্দ্রের তালিকা নিতে হবে।
কংগ্রেস নেতা আশুতোষ চ্যাটার্জি বলেন, ‘খসড়া তালিকা ধরাতে ডাকা হয়েছিল। বৈটক সম্পূর্ন হয়নি। কমিশনের কাছে এবং সরকারি আধিকারিকদের কাছে ভোটার তালিকা ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে কোন উত্তর নেই।’
এদিন মমতা তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তারা স্বচ্ছ ভোটের পক্ষে। বৈশ্বানর চ্যাটার্জি বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছা ভোটের পক্ষে। কমিশন বিজেপিকে খুশি করতে সব কাজ করছে।’ উল্লেখ্য গত কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচন ভোট লুঠ করে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। সব ওয়ার্ড কার্যত বিরোধী শূন্য করে জয়ী হয়েছিল তারা।
বিজেপির পক্ষ থেকে চিত্তরঞ্জন দে দাবি করেন, তাদের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিষয় কোন অভিযোগ নেই। তিনি দাবি করেন ভোটার লিস্ট প্রকাশ হওয়ার পর ট্রাইবুন্যালে যেই নাম গুলোর নিশপত্তি হয়েছে তা যুক্ত করা হবে। চিত্তরঞ্জন দে’র কথায়, বিরোধীরা অনেক কথা বলেছে আমরা তা শুধু শুনে গিয়েছি। পোলিং স্টেশন নিয়ে আপত্তি এবং দাবি জানানো যাবে বলে দাবি করা হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। তাদের কথায়, কমিশনের কথায় তারা সন্তুষ্ট।
উল্লেখ্য এসআইআর-এর পর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটার বাদ পড়ার সংখ্যায় বিপুল ফারাক রয়েছে। কোথাও বাদ পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ, কোথাও সংখ্যাটা তুলনায় অনেক কম। যেমন জোড়াসাঁকো বিধানসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ১২,৭৬৬ ভোটারের মধ্যে ৫৫৬৬ জনের নাম বাদ গিয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্য একটি ওয়ার্ডে বাদ পড়ার সংখ্যা ৯২২৮। ওই বিধানসভায় মোট নাম বাদ গিয়েছে ৭৩,০০৮ ভোট। উল্লেখ্য কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডে বিচারাধীন অবস্থায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। ২৩টি ওয়ার্ডে এই ধরনের বাদ পড়ার হার ৫ থেকে ২৬ শতাংশের মধ্যে।
এই পরিসংখ্যান শুধু ভোটার তালিকার প্রশাসনিক সংশোধনের প্রশ্ন নয়, নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ, যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। তাদের বসবাস, পরিচয় বা নাগরিক জীবনের সঙ্গে এলাকার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় তারা বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এবার পৌরভোটেও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচনে নিজেদের মত প্রকাশের অধিকার থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হতে পারেন।
উল্লেখ্য কলকাতার পুর এলাকার প্রায় ৮৫ হাজার ভোটারের আপিল এখনও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকার খবর রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক আবেদনের নিষ্পত্তি কবে হবে, তার উপরেও নির্ভর করছে বহু মানুষের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
Election Commission KMC
চুরি করা ভোটার তালিকা দিয়েই ভোট করতে চাইছে কমিশন, সর্বদলীয় বৈঠকের পর জানালো সিপিআই(এম) নেতৃত্ব
সর্বদলীয় বৈঠকে সিপিআই(এম) প্রতিনিধিরা। ছবি : বিধান ভট্টাচার্য।
×
Comments :0