Editorial

সত্য যে কঠিন

সম্পাদকীয় বিভাগ

মেডিক্যাল কলেজ সহ সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও ঘাটতি তুলে ধরে সরকার ও জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা। তার জন্য স্বয়ং প্রাক্তন তৃণমূলী ও বর্তমান বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর রোষানলে পড়েছেন তারা। রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জুনিয়র ডাক্তারদের অপরাধ তারা সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা, পরিকাঠামোর ঘাটতি এবং নেই রাজ্যের দুঃসহ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। হাসপাতালের ভেতরে সরকারি অবহেলার কথা বাইরে ডাক্তারদের মুখ দিয়ে বাইরে চলে‍‌ আসায় সরকার ঘোরতর বেকায়দায় পড়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী তেলে বেগুনে জ্বলে উ‍‌ঠেছেন। হাসপাতালে অব্যবস্থা, জরুরি ওষুধ না মেলা, উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা না থাকায় রোগীদের চূড়ান্ত হয়রানি শুধু হয় না, অনেক সময় মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে যায়।
চোরবাগানের মণ্ডপে পদপিষ্ঠ হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু এবং ৩০-৪০ জনের আহত হবার ঘটনার পর তাদের সকলকে আনা হয় মেডিক্যা ল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চিকিৎসা করে অসুস্থদের বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্তব্যরত ডাক্তাররা। তাদের সাহায্যে ছুটে আসেন হস্টেলে থাকা ডাক্তাররাও। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই আপৎকালীন সময় জরুরি প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ, সরঞ্জাম বা পরিকাঠামো মেলেনি। সেই সমস্যার কথা ডাক্তাররা সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে ব্যক্ত করেছিলেন। তাতেই প্রবল ক্ষিপ্ত মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতালের ভেতরে এহেন সরকারি নগ্ন ব্যর্থতা গোপন থাকুক সেটাই চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তিনি ডাক্তারদের শায়েস্তা করার হুঙ্কার দিয়েছেন।
মেডিক্যা ল কলেজের পরিকাঠামোর যে করুণ অবস্থা সেটা ডাক্তাররা প্রকাশ্যে না বললেও বুঝতে অসুবিধা হতো না সরকারি পদক্ষেপের ফলে। চোরবাগান ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবার পর সরকারই অতি সক্রিয় হয়ে রোগীদের বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করে এবং চিকিৎসার যাবতীয় খরচা সরকারি তহবিল থেকে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। তার স্বাস্থ্য মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজেরাই মনে করেছেন তাঁদের পরিচালিত সরকারি মেডিক্যাতল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসা হবে না। অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থাই নেই। তাই সরকার নিজেরাই নিজেদের হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরিয়ে বেসরকারি ব্যবসায়িক হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। প্রকারান্তরে রাজ্যবাসীকে সরকার বার্তা দিয়েছে তারা যে সরকারি হাসপাতালে ভরসা না করে বেসরকারি হাসপাতালে যান। সরকারি হাসপাতালে প্রত্যাশিত চিকিৎসা মিলবে না। এটা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা গুটিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্রেরই অংশ। পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসার চাহিদা বৃদ্ধি ও মুনাফা বৃদ্ধির পরোক্ষ উমেদারি করা। সরকার পরোক্ষে যে সত্যকে উন্মোচিত করেছে জুনিয়ার ডাক্তাররা সেটা সরাসরি সামনে এনেছেন। তাতে শুভেন্দুর গোঁসা হবে কেন?

Comments :0

Login to leave a comment