সংসদের বাইরে নজিরবিহীন রাজনৈতিক উত্তেজনা। সংসদ ভবনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার মকর দ্বারের সামনে মুখোমুখি অবস্থানে শাসক ও বিরোধী শিবিরের সাংসদরা। দু’পক্ষের সাংসদরা পরস্পরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝখানে মানবপ্রাচীর তৈরি করেন নিরাপত্তারক্ষীরা। হাত ধরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে বিরোধী ও এনডিএ সাংসদদের আলাদা করে রাখেন তারা।
বিরোধীদের মূল দাবি, দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের দমন-পীড়ন নিয়ে সংসদে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বিবৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি অযোধ্যার রাম মন্দিরে সংগৃহীত অনুদানের টাকা নিয়ে তছরুপের অভিযোগ নিয়েও সংসদে আলোচনা দাবি করেছে বিরোধী শিবির।
এর পাল্টা বিক্ষোভে বিজেপি-সহ এনডিএ সাংসদরা কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে সংসদে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, ঝাড়খণ্ডে কংগ্রেস শাসক হেমন্ত সোরেন সরকারের শরিক হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ছাত্রদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। অথচ দিল্লির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইছেন।
এই পাল্টা বিক্ষোভ এমন সময়ে হল, যখন এক দিন আগেই সরকার জানিয়েছিল, ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখতে প্রস্তুত অমিত শাহ। সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছিলেন, সংসদের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত।
তবে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য, বিরোধীরা অমিত শাহের কোনও মতামত শুনতে চান না। দিল্লিতে ছাত্রদের উপর পুলিশের অভিযানের নেপথ্যে কারা ছিলেন, সেই বিষয়ে সরাসরি জবাব চান তারা।
বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভ ও স্লোগানের জেরে লোকসভার অধিবেশন বারবার মুলতবি হয়েছে। একাধিক দিন কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ ছাড়াই কেটেছে।
বাদ যায়নি স্পিকার ওম বিড়লার আবেদনও। বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ সপ্তাহে তিনি বলেন, ‘সরকার জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব দিতে প্রস্তুত। আপনাদের মূল দাবিটি সরকার মেনে নিয়েছে। অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। তাই সংসদের কাজে সহযোগিতা করুন।’
কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
মকর দ্বারে বিজেপি সাংসদ মুকেশ দলালকে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তিনি বলতে থাকেন, ‘শরম করো, শরম করো, রাহুল গান্ধী, শরম করো।’
সেই সময় সংসদে প্রবেশ করেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া বিজেপি সাংসদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রিয়াঙ্কা তাকে বলেন, রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
জবাবে ক্ষুব্ধ বিজেপি সাংসদ বলেন, ‘ঝাড়খণ্ডে যান। আপনি কেন ঝাড়খণ্ডে যাননি?’ প্রিয়াঙ্কা অবশ্য কোনও বিতর্কে না গিয়ে বিরোধী সাংসদদের বিক্ষোভে যোগ দেন।
পরে সাংবাদিকদের প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘বিরোধীদের আন্দোলনের কারণেই সরকারপক্ষের সাংসদদেরও বিক্ষোভে নামতে হয়েছে। এই প্রথম আমরা দেখছি, সরকারপক্ষের সাংসদরা বিক্ষোভ করছেন। আমরা তাদের এই জায়গায় আসতে বাধ্য করেছি। এবার তারা সামনে এসে বক্তব্য রাখুন।’
ঝাড়খণ্ডে জেপিএসসি এবং জেএসএসসি-র পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। রাঁচিতে বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তারা আন্দোলনে নামেন।
বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকে সামনে রেখেই বিজেপি সাংসদরা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ঝাড়খণ্ডে ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জের জবাব দিন রাহুল গান্ধী।’
বিজেপি সাংসদ অনুরাগ ঠাকুর বলেন, ‘ঝাড়খণ্ডের যুবকদের ন্যায়বিচার দিতে হবে। তাদের উপর যেভাবে লাঠিচার্জ ও অত্যাচার করা হয়েছে, তা রাহুল গান্ধীর মানসিকতার পরিচয়।’
অমিত শাহ সংসদে জবাব দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সংসদের কাজে অংশ নিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। অনুরাগের দাবি, ‘স্রেফ সংবাদ শিরোনামে থাকার জন্য কংগ্রেস মিথ্যা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিচ্ছে।’
পাল্টা কংগ্রেস সাংসদ মানিকম ঠাকুর নিখোঁজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে লোকসভায় উপস্থিত হয়ে জবাব দেওয়ার দাবি জানান। তার অভিযোগ, ২০ জুলাই যন্তর মন্তরে ছাত্রদের বিক্ষোভে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার দাবি, অমিত শাহ সংসদ চত্বরেই উপস্থিত রয়েছেন, অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদের কার্যপ্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন না।
ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় রাহুল গান্ধীকে টেনে বিজেপির আক্রমণেরও জবাব দেন কংগ্রেস সাংসদ। তার যুক্তি, ‘ঝাড়খণ্ডে যা ঘটেছে, তার জন্য ঝাড়খণ্ড সরকার দায়ী। রাহুল গান্ধী সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। দিল্লিতে যা ঘটছে, তার জন্য অমিত শাহ দায়ী, কারণ দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে।’
এর আগে সোমবার ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর পুলিশের বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার ছাত্রদের রয়েছে এবং সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ আলোচনা।
রাহুলের বক্তব্য, ‘ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর বলপ্রয়োগ করা ভুল। ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে। শুধু আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। ঝাড়খণ্ড সরকারকে অবিলম্বে ছাত্রদের কথা শুনে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে।’
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সংসদে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। তার বক্তব্য, শিক্ষা, পরীক্ষা এবং রাম মন্দির এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং এগুলি নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
অখিলেশ বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগেও যা বলা হচ্ছে, তা বলা যেত। তখন কেন বলা হল না? কারণ তারা আসলে আলোচনা চান না। আলোচনার পাশাপাশি তারা রামের নামটিও উচ্চারণ করতে চান না।’
ঝাড়খণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি একমাত্র পথ হল আলোচনা। ছাত্রদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কথা বলা প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী এবং সরকার ইতিমধ্যেই ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’
ফলে সংসদের শেষ সপ্তাহে অমিত শাহের বিবৃতি, দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা, ঝাড়খণ্ডে পরীক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ এবং অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান নিয়ে অভিযোগ সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সংসদের ভিতরের অচলাবস্থার পাশাপাশি এবার সেই উত্তাপ পৌঁছে গেল সংসদ ভবনের বাইরেও।
Parliament
সংসদের বাইরে নজিরবিহীন বিক্ষোভ শাসক, বিরোধী শিবিরের
×
Comments :0