রণদীপ মিত্র : সিউড়ি
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘরের দরজায় টোকা মারার আওয়াজ। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন আনোয়ারা বিবি। মুরারই ২নং ব্লকের কাশিমনগরের বাসিন্দা এই প্রৌঢ়া রীতিমতো বিধ্বস্ত। কারণ পাঁচ ছেলেমেয়ে সহ নিজের নাম ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’। ভোটার তালিকা দেখে ঘুম উড়েছে মহিলার। তাই দিনের আলো ফোটার আগেই সটান হাজির হয়ে গিয়েছিলেন বিএলও’র বাড়ি। বিএলও কবিরুল ইসলাম আধঘুমে উঠে মুখোমুখি হয়েছেন তাঁর বুথের ভোটারের। উত্তর দিয়েছেন, ‘‘আমি নিজেও জানি না কেন এমন হলো? ভবিষ্যতে কি হবে তাও জানি না। তবে আমার যা হবে আপনারও তাই হবে!’’
উত্তর নেই বিএলও’র কাছে। কারণ বিএলও নিজেও তো ‘বিবেচনাধীন’। বীরভূমের মুরারই বিধানসভার কাশিমনগর গ্রামের ২৪০ নম্বর বুথে বিএলও এই কবিরুল ইসলাম। শুনে খানিকটা থমকাতে হয়, শুধু কবিরুল ইসলাম একা নন, তাঁর পাশের পরপর পাঁচটি বুথের বিএলও সকলেই ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছেন। রবিবার ভোররাতে ভোটারের ডাকে কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে কৈফিয়ত দেওয়ার এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন এই কবিরুল ইসলাম। তিনি নমুনা মাত্র। ‘বিবেচনাধীন’ গেরোয় নতুন করে এক ঝঞ্ঝাটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিএলও’দের। সেই বিপন্নতার কথা শোনাতে গিয়ে কবিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘‘আমার বুথে ৭৫ জন রয়েছেন ‘বিবেচনাধীন’। তার মধ্যে আমিও একজন। ভোটার তালিকা হাতে পাওয়ার পর থেকে ভোটারদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার জবাব দিতে ক্লান্ত।’’
একরাশ হতাশা ঝরে পড়েছে এই বিএলও’র গলায়। সাথে রয়েছে ক্ষোভ, প্রশাসনিক অসহযোগিতার অভিযোগও। কবিরুল ইসলামের কথায়, ‘‘২০০২ সালে কমিশনের ভুলে ভোটার তালিকায় আমার নাম হয়েছিল কবিরুল ইসলাম সেখ। আমার নামে কোনোদিনই ‘সেখ’ ছিল না। পরে স্বাভাবিকভাবেই নথি সহযোগে সংশোধন করে ভোটার তালিকায় আমার নাম শুধু ‘কবিরুল ইসলাম’ করি। ২০২৫’র তালিকা ও ২০০২’র তালিকায় নামের ফারাক থাকায় স্বাভাবিক নিয়মে ডাক পাই শুনানিতে। মাধ্যমিক সহ অন্যান্য সব নথি জমা দিই। তারপরেও এমন হলো কেন জানি না।’’
কবিরুল ইসলাম একা নন, তিনি সহ এই মুরারই ২নং ব্লকের কশিমনগর গ্রামের পরপর পাঁচটি বুথ যেমন ২৩৫, ২৩৮, ২৪০,২৪১ ও ২৫১’র পাঁচ বিএলও’ই রয়েছেন ‘বিবেচনাধীন’র তালিকায়। যেমন ২৩৫ নং বুথের বিএলও জামিরুল ইসলামের নাম ২০০২’এ হয়ে গিয়েছিল জামিরুল মুন্সি। তিনিও সংশোধন করেছেন। একইভাবে তিনিও আজ পড়েছেন বেকায়দায়।
এসআইআর’র নামে গত কয়েকমাস ধরে এক অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে রাজ্যে। ভোটার তালিকা বেরোনোর পরেও পরিস্থিতি বদল হয়নি। প্রতিবাদে সোমবার বীরভূম জেলাজুড়ে পথে নেমেছিল সিপিআই(এম)। নানুরে মিছিল করে বিডিও’র কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। তাতে উপস্থিত হয়ে সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য শ্যামলী প্রধান বলেছেন, ‘‘একজনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না। ‘বিচারাধীন’ কেন তার কারণ প্রকাশ্যে আনতে হবে। বৈধ ভোটার যারা তাঁদের অবিলম্বে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’’ এছাড়াও এদিন নলহাটি, মল্লারপুর, ময়ূরেশ্বর, রাজনগর, মহম্মদ বাজার, বোলপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় এসআইআর নিয়ে মানুষকে বিপর্যস্ত করার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানানো হয়েছে সিপিআই(এম)’র পক্ষ থেকে।
কমিশনের তথ্য বলছে, বীরভূম জেলাতে ‘বিবেচনাধীন’ বা ভোটার তালিকায় ‘আন্ডার অ্যাডজুডিফিকেশন’ স্ট্যাম্প পড়েছে ২ লক্ষ ২ হাজার ৫৯ জন ভোটারের নামের উপর। উপরের দিকে রয়েছে সংখ্যালঘু নিবিড় বিধানসভা এলাকাগুলিই। এই বীরভূমে ‘ডিলিশন’র সংখ্যা ১১,৬০৬। স্বাভাবিকভাবেই বিপুল সংখ্যক ভোটারের ভবিষ্যৎ কি? এই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। এতদিন কোনও সমস্যা হলে তাঁরা ছুটতেন ‘কাছের লোক’ বিএলও’দের কাছে। এখন বিএলও’দের কাছে গিয়ে শুনতে হচ্ছে, ‘‘আমারও তো একই অবস্থা। কি হবে জানি না!’’
BLOs under Adjudication
বিএলও’রাই ‘বিবেচনাধীন’! উৎকণ্ঠার জবাব দেবে কে?
বিক্ষোভ নানুরে।
×
Comments :0