অনিন্দিতা দত্ত: শিলিগুড়ি
দশ বছরে প্রতিশ্রুতি শুনলেও জীবন বদলায়নি চা শ্রমিকদের। তবে, মঙ্গলবার, উত্তরকন্যায় শীর্ষস্তরের বৈঠকের পর বিজেপি’র দাবি, এবার বাগানে চালু হবে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে উন্নতির প্রকল্প।
এদিন বৈঠকের পর দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা বলেছেন, ‘‘রাজ্যে বিজেপি সরকার আসীন হওয়ার পরই ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনা‘ চালু করা হয়েছে। সরকারকে ৩১৩ কোটি টাকা খরচ করতে হবে আগামী নয় মাসের মধ্যেই।‘‘
বিস্তার বক্তব্য, উত্তরবঙ্গে চা বাগান উন্নয়নে ‘আসাম মডেল’ প্রয়োগ কার হবে। তবে এই আসাম মডেলের হকিকৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন চিয়াকামান মজদুর ইউনিয়নের দার্জিলিং জেলা সাধারণ সম্পাদক গৌতম ঘোষ। তবে এদিন বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।
গৌতম ঘোষ বলেছে, ‘‘আমাদের দাবি অবিলম্বে চা শ্রমিকদের স্বার্থে আইন মোতাবেক ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করতে হবে। বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকার অকর্মণ্যতার পরিচয় দিয়েছে। ১৯ রাউন্ড মিটিং হওয়ার পরে আজও ন্যূনতম মজুরি অধরা রয়ে গেছে। বাগিচা শ্রমিকদের পিএফ, গ্রাচুইটি বকেয়া পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। দিল্লিতে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি, সবটাই বিজেপি নেতারা জানেন। ’’
সাংসদ জানান, ‘‘বাগানে বাগানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতির স্বার্থে ব্যয় করা হবে বরাদ্দ টাকা। এই পরিমান টাকা খরচ করার জন্য উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরকে নোডাল এজেন্সি করা হয়েছে। হাই লেভেল কমিটি তৈরী হয়েছে। পরবর্তীতে ন্যূনতম মজুরি চালু করা নিয়েও এদিনের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের উপস্থিতিতে শিলিগুড়ি সংলগ্ন উত্তরকন্যাতে এই বৈঠকে যোগ দেন দার্জিলিঙ, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারের সাংসদ, বিধায়ক, জেলা শাসক, টি বোর্ড সহ অন্যান্য আধিকারিকরাও যোগ দেন।
চা বাগানে ভোট আদায় করতে ২০১৬ ও ২০২১’র বিধানসভা নির্বাচন বা ২০১৯ ও ২০২৪’র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩৫১ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবার প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চা শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। কিন্তু ‘মোদী কা গ্যারান্টি‘ সম্পূর্ণ ফ্লপ। কথা রাখেননি তিনি। উলটে বিজেপি কেন্দ্রে আসীন হওয়ার পর থেকে প্রায় চল্লিশ শতাংশ চা বাগান বন্ধ হয়ে গেছে।
বিস্তা এদিন বলেন, ‘‘ন্যূনতম মজুরি চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন থানায় শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বকেয়া সংক্রান্ত প্রায় ১৭৫টি মামলা রয়েছে। চা বাগানের মালিকপক্ষকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে শ্রমিকদের পিএফ, গ্রাচ্যুইটির টাকা কোনভাবেই আটকে রাখা চলবে না। তিন শতাধিক চা বাগানগুলির মধ্যে ছোট বড় সমস্ত বাগানকেই সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু তাই নয়, শারদোৎসবের আগে বোনাস সংক্রান্ত বিষয়ে কোন বৈঠকও হবে না। মালিকদের সমস্ত সেটিং বন্ধ করা হবে।’’
এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন সাংসদ মনোজ টিগ্গা ও প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা।
এদিকে শ্রমিক নেতা গৌতম ঘোষ বলেছেন, ‘‘তরাইয়ে লংভিউ চা বাগানে মহিলা শ্রমিকরা ৪০দিন ধরে রিলে অনশনে শামিল। আমরা চিয়া কামান মজদুর ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা সেখানে লড়াইতে রয়েছি। ৮৩ লক্ষ টাকা গ্রাচুইটি ও ১২ কোটি টাকা পি এফ এর বকেয়া পড়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার পিএফ কমিশনার সবটা জানেন।’’
লং ভিউ চা বাগানে প্রায় ১২০০ শ্রমিক ছিলেন। সেই সংখ্যাটা কমতে কমতে ৩০০-তে দাঁড়িয়েছে। না খেতে পেয়ে বাগানে শ্রমিকদের মৃত্যু হচ্ছে। কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যাচ্ছে শ্রমিকেরা। গৌতম ঘোষ বলেন, ‘‘বিজেপি বড়লোকদের তল্পিবাহক। কর্পোরেট পুঁজিকে বাহবা দিচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে রাজ্যে এই সরকার গঠিত হয়নি। কার্যক্ষেত্রে কতটা বাস্তবায়িত হবে সে নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।’’
তিনি জানান যে শুধু লং ভিউ চা বাগান নয়, নকশালবাড়ি, অটল, গয়াগঙ্গা সহ তরাইয়ের একাধিক চা বাগানে পিএফ বকেয়া পড়ে রয়েছে।
‘আসাম মডেল’ প্রসঙ্গে গৌতম ঘোষ বলেছেন, ‘‘আসাম মডেলের বাস্তবে খুবই করুন অবস্থা। আসামে চা শ্রমিকরা খুবই দুরবস্থায় রয়েছেন। সেখানেও চা শ্রমিকদের জমির অধিকার দেওয়া হয়নি। আসামের ডোলো চা বাগানে জমি অধিগ্রহণ করে এয়ারপোর্ট বানানো নাম করে জেসিবি চালিয়ে চা বাগানের গাছ উপড়ে ফেলে বাগান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডোলো চা বাগানের মডেল যদি পশ্চিমবাংলার চা বাগানের মডেল হয় তাহলে আমরা বামপন্থীরা সর্বাত্মক আন্দোলনে থাকব।’’
Comments :0