editorial

গোরুর গাড়ির হেড লাইট

সম্পাদকীয় বিভাগ

কয়েকদিন আগে কেরালার বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকার স্নাতক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ঘোষণা করেছে। এতদিন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা ছিল অবৈতনিক। এখন থেকে স্নাতকেও ছাত্র-ছাত্রীরা বিনামূল্যে লেখাপড়া করতে পারবে। দেশে কোন রাজ্যে সব অংশের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে পৌঁছে দেবার এই ব্যবস্থা নেই। শুধু বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগই নয়, কেরালায় শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবে বিবেচিত হয় সরকারের কাছে। তাই মোট রাজ্য বাজেট বা রাজ্য জিডিপি’র বড় অংশ ব্যয় হয় শিক্ষা খাতে। কেরালার বামপন্থী সরকার এটা উপলব্ধি করে শিক্ষার প্রসার ও বিকাশের মধ্য দিয়ে যে মানব সম্পদ তৈরি হয় সেটাই আসতে হয়ে ওঠে সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নতির মূলধন। কোনও সমাজকে যদি সত্যি সত্যি অগ্রগতির শিখর ছুঁতে হয় তবে সর্বাগ্রে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও উন্নত করতে হয় এবং শিক্ষাকে সকল অংশের ছেলেমেয়েদের কাছে সমান লভ্য করতে হয়। কেরালা সেটাই করে চলেছে। তাই কেরালা আজ শিক্ষায় দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্য।
কেরালা যখন তাদের সকল ছেলেমেয়েদের জন্য কলেজ শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা করছে তখন রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথের বাংলার তৃণমূল সরকার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (এডিবি) থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে রাজ্যে ৪৩০টি মডেল স্কুল বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মডেল স্কুলে স্মার্ট ক্লাস রুম, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, আধুনিক ল্যাবরেটরি, শৌচাগার, খেলাধুলার আধুনিক ব্যবস্থা ইত্যাদি থাকবে। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমেও পড়ানো হবে। প্রতিটি ব্লকে একটি করে এবং ৮৭টি পিছিয়ে পড়া ব্লকে অন্তত দু’টি করে এমন স্কুল হবে।
রাজ্যে ১২ হাজার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। বেপরোয়া ও লাগামহীন চুরি দুর্নীতির কারণে শিক্ষক নিয়োগ কার্যত বন্ধ। অর্ধেক শিক্ষক পদই শূন্য। প্রায় সব স্কুলেই এক বা একাধিক বিষয়ের কোনও শিক্ষক নেই। কোথাও তিন-চার জন্য দরকার হলেও আছে একজন। আবার কোথাও ইতিহাসের শিক্ষক অঙ্কের ক্লাস নেন, বাংলা পড়ান বিজ্ঞানের শিক্ষক। অপদার্থ শিক্ষা প্রশাসনের কল্যাণে বেশির ভাগ স্কুলে শিক্ষকের আকাল হলেও কোনও কোনও স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষক। প্রায় সব স্কুলই কোনোরকমে চলছে বেকার ছেলেমেয়েদের পাঁচ-সাত হাজার টাকার ‍‌বিনিময়ে অতিথি শিক্ষক হিসাবে ব্যবহার করে। বস্তুত এ রাজ্যের বিদ্যালয় শিক্ষা টিকে আছে এই অতিথি শিক্ষকের ভরসায়।
স্কুলবাড়ি বছরের পর বছর মেরামত হয় না। ভাঙা চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চ, চক-ডাস্টারের পয়সা নেই। স্কুলের নানা অনুষ্ঠান হয় ছাত্র-শিক্ষকদের দেওয়া চাঁদায়। এহেন রাজ্যে ১২ হাজার স্কুলকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়ে ৪৩০টি সমস্ত ধরনের সুযোগ সুবিধা সহ অত্যাধুনিক মডেল স্কুল তৈরি হবে। তার জন্য ধার করা হবে এডিবি থেকে। কেরালায় মডেল স্কুলের দরকার হয় না। কারণ তাদের সব স্কুলই বাংলার প্রস্তাবিক মডেল স্কুলের মতো উন্নত। তাদের সব স্কুলই মডেল। কারণ তারা সব ছেলেমেয়ের কাছেই আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা পৌঁছে দিতে চান। তৃণমূল ৯০ শতাংশ ছেলেমেয়েদের শিক্ষকহীন ভাঙা স্কুল বাড়িতে রেখে দিয়ে অল্প কিছু ছেলেমেয়ের জন্য মডেল স্কুল বানাতে চায়। সব ছেলেমেয়েরা ভালো লেখাপড়া করে কি হবে। টেনে টুনে মাধ্যমিক উতরে বেকার ভাতা পাবে। তাছাড়া ট্যাব, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সাইকেল ইত্যাদি দিলেই যথেষ্ট। পরে তৃণমূলের হয়ে তোলাবাজি করবে বা পরিযায়ী হয়ে চলে যাবে। কিছু না হলে মদের পর্যাপ্ত জোগান তো আছেই।

Comments :0

Login to leave a comment