দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি
অকাল বর্ষণ ও কালবৈশাখীর প্রভাবে জলপাইগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিঘার পর বিঘা আলুখেত জলের তলায়। জমে থাকা জলে পচন ধরছে ফসলের, অন্যদিকে বাজারে আলুর দর তলানিতে। এই দ্বিমুখী চাপে চরম সঙ্কটে পড়েছেন আলুচাষিরা।
জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের লাহিড়ীপাড়ার কৃষক মনোরঞ্জন মণ্ডল জানান যে তাঁর সাত বিঘা জমির আলু এখনও জলের নিচে। তিনি বলছেন, “এই অবস্থায় আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম নেই, ফলে কীভাবে সংসার চলবে বুঝতে পারছি না।”
একই সুর বাহাদুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানপাড়া এলাকার কৃষক সাধন বর্মন, মানু মোহাম্মদ ও সাত্তার আলির গলায়।
জলপাইগুড়ির সিপিআই(এম) প্রার্থী দেবরাজ বর্মন ও রাজগঞ্জের খরেন্দ্রনাথ রায় প্রচারে গিয়ে কথা বলছেন আলুচাষিদের সঙ্গে। সমস্যার কথা। জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি, মালবাজার য়া ময়নাগুড়ির বামপন্থী প্রার্থীরাও প্রচারে আলুর সহায়ক মূল্যের দাবিতে সরব হচ্ছেন।
তাঁদের হিসাব, এক বিঘা জমিতে আলু চাষে খরচ হচ্ছে ৩০–৩৫ হাজার টাকা, অথচ উৎপাদিত আলু বিক্রি করতে হচ্ছে কেজি প্রতি মাত্র ৩ টাকায়।
সিপিআই(এম)‘র জলপাইগুড়ির জেলা সম্পাদক পীযূষ মিশ্র বলেছেন, “উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১৪ টাকার নিচে নয়, অথচ কৃষক বাধ্য হচ্ছেন ৩ টাকায় বিক্রি করতে। অবিলম্বে কেজি প্রতি ১৪ টাকা সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনতে হবে।” তাঁর দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সুস্পষ্ট ক্রয় নীতির অভাব এবং বাজারে নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জেলার কৃষি পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরছে। উত্তরবঙ্গে এ বছর মোট উৎপাদন প্রায় ৪৮ লক্ষ টন, যার মধ্যে জলপাইগুড়ি জেলাতেই উৎপাদন প্রায় ৮ লক্ষ টন। অথচ সমগ্র উত্তরবঙ্গের ৯৭টি হিমঘরের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১৮ লক্ষ টন। জলপাইগুড়ির ২৭টি হিমঘরে রাখা যায় মাত্র ২.৭০ লক্ষ টন আলু। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের অভাবে বাজারে অতিরিক্ত জোগান তৈরি হয়ে দরপতন ঘটছে।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ লাগাতার বাড়ছে। বীজে ১৬–১৮ হাজার টাকা খরচ। সঙ্গে সার, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি এবং সেচের খরচ বাড়ছে। উপরন্তু বস্তার দাম গত বছরের ৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৪ টাকা। অথচ বাজার দাম তলানিতে নেমে যাওয়ায় কৃষকরা খরচও তুলতে পারছেন না।
অন্যদিকে রপ্তানি কার্যত বন্ধ থাকায় সমস্যার আরও গভীরতা বাড়ছে। নেপাল ও বাংলাদেশে আলু রপ্তানি না হওয়ায় বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্য পূর্ব ভারতের বাজার দখল করায় বাংলার আলুর চাহিদা আরও কমেছে।
এই পরিস্থিতিতে আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলার দাবি জোরদার হচ্ছে। চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চ বা আলু ফ্লেক্স তৈরির মতো শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতে পারেন বলে মত কৃষক সংগঠনগুলির।
কৃষকদের আশঙ্কা, এখনই সরকারি হস্তক্ষেপ না হলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। মাঠ থেকে আলু সরাসরি কেনা ও দ্রুত রপ্তানির ব্যবস্থা না হলে কয়েক মাস পর সাধারণ মানুষকেই ৫০–৬০ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে হতে পারে। তাই অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে সরব হয়েছেন জলপাইগুড়ির।
Comments :0