Salim Jalangi

জলঙ্গীর কর্মীসভায় সেলিম: রুটিরুজির সমস্যা দূর করে সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে বামপন্থীদেরই

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

তৃণমূল এরাজ্যের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সাঁকো ভেঙে দিয়ে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ করে দিচ্ছে বলে সতর্ক করলেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। শুক্রবার মুর্শিদাবাদের জলঙ্গীতে সিপিআই(এম) কর্মীদের একটি সভায় তিনি বলেছেন, যদি উন্নয়নের পথে এগোতে হয়, যদি স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল-রাস্তা-সাঁকো তৈরি করতে হয় তাহলে রাজ্যের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সাঁকো রক্ষা করতে হবে। বাংলার মাটিতে সম্প্রীতির ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু তৃণমূলকে দিয়ে তা ধ্বংস করে বিজেপি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বিদ্বেষের চাষ করছে। রুটিরুজি সহ জনজীবনের সমস্যাগুলি দূর করে উন্নয়ন করতে হলে বামপন্থীদেরই সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। 
এদিন মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্রে বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী ইউনুস সরকারের সমর্থনে জলঙ্গীর রক্সি মোড়ে কর্মীসভায় ভাষণ দেন মহম্মদ সেলিম, সিপিআই(এম)’র জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা এবং প্রার্থী ইউনুস সরকার। সভায় তৃণমূল এবং বিজেপি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করেছেন সেলিম। তিনি একথাও বলেছেন, বাংলার মানুষ এখন এই অপকৌশল ধরে ফেলেছে। তাঁরা বিজেপি এবং তৃণমূলকে পরাস্ত করতে উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। তাঁরা একজোট হচ্ছেন, আমরা বামপন্থীরাও বিজেপি এবং তৃণমূলকে পরাস্ত করতে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে লড়াই করতে নেমেছি। বাংলাকে বাঁচানোর এই সংগ্রামে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এই মহকুমায় রানিনগর, জলঙ্গী, ডোমকল তিনটি আসনেই সিপিআই(এম) জিতবে, এটা মানুষই বলছে। এছাড়াও মুর্শিদাবাদ জেলার হরিহরপাড়া সহ বাকি আসনগুলিতেও জোরদার লড়াই হবে। 
বাংলায় বামপন্থীরা শক্তিশালী থাকতে বিজেপি পা রাখতে পারছিল না বলেই আরএসএস তৃণমূলকে তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন সেলিম। তিনি বলেন, বিজেপি বুঝেছিল বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। বামপন্থীরা শক্তিশালী থাকতে তারা বাংলা দখল করতে পারবে না। তাই কংগ্রেস ভেঙে বানিয়েছিল তৃণমূল। তারপরে তৃণমূল সরকারে এসে খুন-ধর্ষণ, কয়লা-বালি পাচারের রাজনীতি কায়েম করেছে। দুষ্কৃতীদের লুটের ফ্র্যাঞ্চাইজি দিয়েছে মহল্লায় মহল্লায়। তলা থেকে লুট দুর্নীতির ৭৫ ভাগ ওপরে পাঠিয়ে দিয়ে নিচে যা খুশি করতে পারবে। এভাবে আইনের শাসন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রান্তিক মানুষ সবচেয়ে বিপন্ন। তাঁরা দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন, দুর্বৃত্তদের আক্রমণের মুখে পড়ছেন, কিন্তু পুলিশ তো তাদের রক্ষা করবে না। পুলিশ দুর্নীতিগ্রস্তদেরই পাহারা দিচ্ছে। দুর্নীতিগ্রস্তরা তৃণমূল এবং বিজেপি’র মধ্য দলবদলে যাতায়াত করছে, তৃণমূলে থাকলে রাজ্যের পুলিশ পাহারা দিচ্ছে, বিজেপি’তে থাকলে কেন্দ্রের পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। এই জন্যই আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা সহ কোনও অপরাধের তদন্তে পুলিশ অপরাধীদের শাস্তি দেয়নি। রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে পুলিশের তৎপরতাও দেখা যায়নি। আসানসোল, ধুলাগড়, বসিরহাট, সামসেরগঞ্জ কোথাও পুলিশ দাঙ্গা রোধে সক্রিয়তা দেখায়নি। এভাবে সম্প্রীতির সাঁকো ভাঙলে উন্নয়ন হবে না, কেবল বিজেপি’র সুবিধা হবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চাষ করতে।  
তিনি বলেন, অনেকে মনে করেছিলেন নবান্নকে শায়েস্তা করবে ছাপান্ন ইঞ্চির মোদী। কিন্তু মোদী দেশবাসীকেই বারেম বারে বিপদে ফেলেছেন। কোভিডের সময় দেশের এমন অবস্থা হয়েছিল যে অক্সিজেন নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, রেল বন্ধ, মোদী লকডাউন করে মানুষকে বিপদে ফেলেছিলেন, আর এরাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরতে বাধা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। দুই পক্ষই মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এখন ইরানে যুদ্ধ হচ্ছে, এখানে রান্নার গ্যাসের হাহাকার। মোদী এমনভাবে দেশ চালিয়েছেন যে উজ্জ্বলা গ্যাস নিয়ে ফাঁকা প্রচার করেছেন, এখন দেখা যাচ্ছে সিলিন্ডার ফাঁকা, গ্যাস অমিল। দেশের জ্বালানি সুরক্ষা ধ্বংস করেছেন। এলপিজি’র অভাবে রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। কেন এই সমস্যা? এর মূলে সেই যুদ্ধ যার বিরুদ্ধে আমরা বামপন্থীরা বরাবর সোচ্চার থেকেছি। বিজেপি আর তৃণমূল বলুক ওরা যুদ্ধের পক্ষে না বিপক্ষে? এখানেই বামপন্থী আর দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ফারাক। 
সেলিম বলেন, আমেরিকা ইরাককে মেরে এখন ইরানকে মারতে এসেছে। কিন্তু এই সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার দালালি কেন করবে ভারত সরকার? ভারতবাসীর স্বার্থরক্ষায় মোদী কাজ করছেন না। এপস্টিন ফাইল বেরিয়েছে, এখন বিজেপি’র নেতারাই বলছেন প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গিয়ে এমন সব কাজ করেছেন যে তার ছবি তুলে রেখে এখন তাঁকেই ব্যাকমেল করা হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্ল্যাকমেলে চলছেন? অপারেশন সিন্দুর নিয়ে লাফালাফি করছিলেন, ট্রাম্প বলতেই যুদ্ধ বন্ধ! ইরান, রাশিয়া থেকে তেল কেনায় ভারতকে শর্ত বেঁধে দিচ্ছে ট্রাম্প! তাহলে ভারতের সার্বভৌমত্ব কোথায় গেল? 
সভায় জামির মোল্লা বলেছেন, এবারের নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূলকে পরাস্ত করতে মানুষের মধ্যে নিবিড় প্রচারের ওপর জোর দিয়েছি আমরা। প্রতিটি বাড়িতে যেতে হবে, পাড়ায় পাড়ায় বৈঠক করতে হবে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমরা রাজ্যের বাইরে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করবো, তাঁদের এসে ভোট দিতে বলবো। রাজ্যে বিধায়কদের ভাতা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের রোজগার বাড়েনি, কাজের সুযোগই না থাকায় ভিন রাজ্যে কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে, নির্যাতনের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই সব কথা মানুষের কাছে বলে বিচার চাইতে হবে নির্বাচনে। 
এদিন কর্মীসভার পর জলঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্রে বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী ইউনুস সরকারের সমর্থনে একটি প্রচার মিছিলেও শামিল হন মহম্মদ সেলিম, জামির মোল্লা সহ নেতা-কর্মীরা। ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ সেই মিছিলে অংশ নেন। 

Comments :0

Login to leave a comment