অন্যকথা
কেন গান্ধী আজো প্রাসঙ্গিক
ড: দীপ মুখার্জি
১২ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
গান্ধীজির জন্মতিথি উদযাপনের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে অনেকের কাছে মানবপূজন বলে হতে পারে। কিন্তু এই রকম দিন গুলোর তাৎপর্য এই যে আমরা সেই মানুষের স্মৃতিচারনার সঙ্গে সেই সময়ের ইতিহাসটাকেও উপলব্ধি করতে পারি। ইতিহাসের পরিসর শুধু মাত্র বিখ্যাত মানুষের ক্রিয়াকলাপে আবদ্ধ থাকে না। সামগ্রিক মানবসভ্যতার গতিপথকে নথিভুক্ত করে ইতিহাস।
পদার্থবিদ্যার একটি শাঁখা হল মেকানিক্স। মেকানিক্স এর মাধ্যমে কোনো কণার অতীতের অবস্থান ও গতিবেগ থেকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারি। ভবিষ্যৎ জানার জন্য ও পরিবর্তন করার জন্য অতীত জানা প্রয়োজন, সেটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাই হোক বা মানব সভ্যতা সব ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য।
সময়ের সাথে সাথে ভারতবর্ষ বিবর্তিত হয়েছে, অন্যান্য যেকোনো দেশের মতোই ভারতবর্ষের পরিচয় নিহিত আছে ভারতবাসীর মধ্যে। এই জনগণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে। গান্ধীজি এবং আরো অনেকে পথ প্রদৰ্শন করেছিলেন, কিন্তু সেই পথের ভিড় তৈরী করেছিল সাধারণ জনতা। দীর্ঘ দুই শতকের ব্রিটিশ দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে এক স্বরে প্রতিবাদ করেছিল। তখনও জাতি প্রথা ছিল, ধর্মের বিভেদ ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেকে সেই গন্ডিতে বদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু সেটা এক বিশেষ রকমের পরাধীনতা। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে নিবেদন করার আগে তাদেরকে এই মানসিক বন্দীদশা থেকে মুক্ত হতে হয়েছে। গান্ধীজির দেখানো পথের সার্থকতা এখানেই, যেখানে একজন শারীরিক ভাবে চরম দুর্বল মানুষও আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। মিছিলের প্রান্তে হেঁটে চলা সেই ধুঁকতে থাকা মানুষটির কাছেও আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা যে স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, তার কৃতিত্ব মিছিলের মুখ থেকে প্রান্তিক মানুষটা সকলের ই প্রাপ্য।
এই একই পথে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্ট । সব কিছুর ক্ষেত্রের মূলে রয়েছে আপাত নিরীহ মানুষের নীরব প্রতিবাদ।
যেসব রাজনৈতিক দল মানুষকে তাদের ভোটবাক্সের কারেন্সি মনে করে, তারা জাতি, ধর্ম প্রভৃতিকে অস্ত্র করে এই সাধারণ মানুষকে বিভক্ত রাখে। নিজের কতটা সামগ্রিক উন্নতি হচ্ছে তার দিকে না ভেবে মানুষকে ওপর গোষ্ঠীর কত কষ্ট হচ্ছে সেই আনন্দে মোহিত থাকে । এই গোষ্ঠী দ্বন্দ্বই রাজনৈতিক দল গুলোর ক্ষমতাতে থাকার একমাত্র উপায়। সাধারণ মানুষ যখন এই গোষ্ঠী কেন্দ্রিক মানসিকতা ভেঙে একত্রিত হবে, তখন এই রাজনৈতিক দল গুলোও বাধ্য হবে নিজের চরিত্র বদলাতে । তাই সেই জন আন্দোলনের প্রয়োজন আছে, যেখানে জনতার কোনো রং নেই। সব রকম রং মিলেই সাদা রং তৈরী হয়। এখনকার সময়ে আরো অনেক গান্ধীজির মতো স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষ প্রয়োজন। যারা দেশের জন্যে ক্ষুদ্র স্বার্থ অতিক্রম করে মানুষকে জোটবদ্ধ হতে অনুপ্রেরিত করছেন, তাদের সকলের হৃদয়ে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত গান্ধীজি বিরাজ করছেন।
Comments :0