মুক্তধারা
প্রবন্ধ
এ. পি. জে. আবদুল কালাম
স্বর্ণেন্দু দাস
১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
ভারতের ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষের নাম শুধু একটি পরিচিতি হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি দর্শন এবং কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে খোদাই করা থাকে। তেমনই এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আব্দুল কালাম। যিনি সাধারণ মানুষের কাছে 'জনগণের রাষ্ট্রপতি' এবং 'মিশাইল ম্যান' হিসেবে চিরকাল শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রামেশ্বরের এক অতি সাধারণ পরিবার থেকে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ অলঙ্কৃত করার এই যে মহাকাব্যিক জীবনযাত্রা, তা এক চরম নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের জীবন্ত দলিল।
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামেশ্বৰমে এক দরিদ্র তামিল মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। জীবনের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে শৈশবে তাঁকে খবরের কাগজ পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু অভাব কোনোদিন তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে পাঁচিল তুলতে পারেনি। পদার্থবিজ্ঞান এবং পরবর্তীতে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যোগ দেন ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থায় (DRDO) এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ISRO)। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান ‘SLV-III’ এবং অগ্নি ও পৃথ্বীর মতো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল রূপায়ণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৮ সালের পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষাতেও তিনি পালন করেছিলেন মূখ্য ভূমিকা, যা ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য সামরিক মর্যাদা এনে দেয়।
তবে কেবল বিজ্ঞান সাধনা বা রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদার মধ্যে ড. কালামের পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর আসল শক্তির জায়গা ছিল তাঁর অমায়িক ব্যক্তিত্ব, অনাড়ম্বর জীবনযাপন এবং যুবসমাজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তাই রাষ্ট্রপতি ভবনের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে তিনি সবসময় ছুটে যেতেন স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। তাঁদের শোনাতেন স্বপ্নের কথা। তাঁর বিখ্যাত উক্তি আজও কোটি কোটি তরুণ হৃদয়ে অনুরণিত হয়— "স্বপ্ন তা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যা মানুষকে ঘুমোতে দেয় না।"
তিনি ভারতকে এক উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার রূপরেখা তিনি এঁকেছিলেন তাঁর ‘ভিশন ২০২০’ পরিকল্পনায়। তিনি চেয়েছিলেন প্রযুক্তি ও মানবতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাতে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজের সেই আদর্শে অবিচল ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই শিলং-এর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময়ই এই মহৎ প্রাণ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।
ড. এ পি জে আব্দুল কালাম আজ আমাদের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া দর্শন, জীবনবোধ এবং অমূল্য কর্ম আজও ভারতের আকাশে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে প্রতিকূলতাকে জয় করে শিখরে পৌঁছানো যায়, এবং শিখরে পৌঁছেও কীভাবে মাটির কাছাকাছি থাকা যায়। সমকালীন ভারতের বুকে তিনি এক আলোকবর্তিকা, যা যুগ যুগ ধরে প্রতিটি মানুষকে দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাসের মন্ত্রে দীক্ষিত করে যাবে।
দশম শ্রেণী
কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা
Comments :0