নিঝুম রাত, রুপোলি চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। ডুয়ার্সের শান্ত পরিবেশে এক অনন্য কর্মযজ্ঞের সাক্ষী থাকল আলিপুরদুয়ারের ঐতিহাসিক মাঝের ডাবরি চা বাগান। প্রতি বছরের মতো এবারও সাড়ম্বরে পালিত হলো ‘মুনলাইট প্লাকিং’ বা জ্যোৎস্নালোকে চা পাতা তোলার বিশেষ উৎসব।
সাধারণত উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের চা বাগানগুলিতেই এই ধরনের প্রথা দেখা যায়। তবে ডুয়ার্সের সমতলে মাঝের ডাবরি চা বাগানই প্রথম এই অভিনব উদ্যোগকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি পূর্ণিমার রাতে— মূলত দোল বা বুদ্ধ পূর্ণিমায়— এই বিশেষ চা পাতা সংগ্রহের কাজ হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ। সূর্যালোকের অনুপস্থিতিতে রাতে চা পাতার সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। ফলে পাতার ভেতরকার প্রাকৃতিক সুগন্ধ ও খনিজ উপাদানগুলি অক্ষুণ্ণ থাকে। শীতল পরিবেশে সংগৃহীত এই পাতা থেকে তৈরি চায়ের স্বাদ ও সুবাস দিনের বেলায় তোলা চায়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও পরিশীলিত হয়।
এই আয়োজন কেবল নিছক চা সংগ্রহের কাজ নয়, বরং এক বর্ণাঢ্য উৎসবে রূপ নেয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত চা শ্রমিকরা পিঠে ঝুড়ি এবং মাথায় হেডল্যাম্প নিয়ে বাগানে নামেন। আদিবাসী ঝুমুর গান ও মাদলের বোলে গোটা বাগান চত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে। শ্রম ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন চোখে পড়ে। মায়াবী দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় জমান বহু পর্যটক। বাগান কর্তৃপক্ষের তরফে অতিথিদের জন্য টেলিস্কোপে চাঁদ দেখা এবং সদ্য প্রস্তুত চায়ের স্বাদ গ্রহণের বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে এই ‘মুনলাইট টি’-র ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গুণমান অনুযায়ী এই চায়ের প্রতি কেজির দাম ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। বাগান ম্যানেজমেন্টের মতে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল বাণিজ্যিক মুনাফা নয়, বরং ডুয়ার্সের পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় জনজাতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা।
প্রথাগত চা শিল্পের সংকটের মাঝে মাঝের ডাবরির এই উদ্ভাবনী প্রয়াস নতুন দিশা দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
Moonlight Tea Plucking
জ্যোৎস্নালোকে চা পাতা চয়ন, মাঝের ডাবরিতে এক মায়াবী উদ্যোগ
×
Comments :0