নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা
কুমারী
কৃশানু ভট্টাচার্য্য
১৮ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
আজ অষ্টমী। সকাল থেকেই প্রীতিসাদের মামা বাড়িতে তুমুল হইচই। সকাল সকাল ওর মা ওকে নিয়ে এসেছেন মামা বাড়িতে। ওর বড় মামার মেয়ের পাড়ার একটা আশ্রমে দুর্গাপুজোয় কুমারী হিসেবে পূজা হবে। প্রীতিসা তো অবাক! মিন্টি দিদি ওর থেকে কয়েক বছরের বড়। হয়তো ওর থেকে বেশ কয়েকটা ক্লাস ওপরেই পড়ে। কিন্তু তা বলে ও এত বড় হয়ে গেল যে ওকে সবাই পুজো করবে? প্রশ্নটা সবার সামনে করা যাচ্ছে না, কারণ সকলেই সকাল থেকে মিন্টিকে নিয়ে খুব ব্যস্ত। ওই সকাল দশটা নাগাদ মিন্টিকে লাল রঙের বেনারসি পড়িয়ে নানা রকমের গয়না দিয়ে সাজিয়ে আশ্রমে নিয়ে যাওয়া হল। সকলের সঙ্গে প্রীতিসাও চলল আশ্রমে। ওই আশ্রমে আবারো দিদার খুব দাপট। সন্ধ্যায় আরতির সময় ওর দিদা প্রতিদিন ওই আশ্রমে যান। দু একবার বাবা বাড়িতে গিয়ে প্রীতিসাও গেছে সন্ধ্যেবেলায়। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা।
আশ্রমে একটা জায়গায় দুর্গাপুজো হচ্ছে। একটা ঠিক সামনে একটা বড় কাঠের পিড়ির ওপরে মিন্টি দিদিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার সামনে নানা ধরনের খাবার দাবার। রয়েছে বেশ কিছু খেলনা। আর রয়েছে নতুন জামাকাপড়, বই খাতা , রং পেন্সিল আরও কত কি। এসব নতুন নয় , জন্মদিনে এরকম অনেক কিছুই পাওয়া যায় । অতএব ওটা নিয়ে খুব একটা ভাবনার কিছু নেই। যেটা সবচেয়ে বেশি অবাক লাগছে সেটা হল মিন্টি দিদিকে গলায় মালা পরিয়ে, কপালে চন্দনের টিপ দিয়ে পিড়ি র উপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামনে বেশ কয়েকজন বসে নানা মন্ত্র বলে পূজা করছে। সবাই বলছে কুমারী পূজা। মিন্টি দিদির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ও অনেকটা অবাক হয়ে গেছে। কিন্তু চারপাশের লোকজন দেখে সে আর বিশেষ কিছু বলছে না। একসময় পূজা শেষ হয়ে গেল। হাতে একটা চকলেট এর বড় বাক্স নিয়ে মিন্টি দিদি উঠে এলো। ওর মতো আরো যারা ছোট তাদের সবাইকে চকলেটের ভাগ দিল। কিন্তু এই যে পিড়িতে বসিয়ে মন্ডপে পূজো, এটা নিয়ে আর কারো সঙ্গে খুব একটা কথা বলা গেল না।
বিকেলে মার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এসেছে প্রীতিসা। আগামীকাল ওদের পাড়ায় সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া হবে। বাবা সেটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। তার আগে বাবা একবার বিকেলে বাড়িতে এসেছে ।প্রীতিসার যাবতীয় প্রশ্ন ওই বাবার কাছেই।
এক ফাঁকে সে হাজির হলো ওর প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে। চোখ মুখ দেখলেই বাবা বুঝতে পারছিলেন যে অনেক কিছু জিজ্ঞাসার আছে। আজকে খুব তাড়া। তাই আগেই বলে দিলেন ," যা বলবি তাড়াতাড়ি করে বল , আমাকে অনেক কাজ করতে হবে। "
"আচ্ছা তুমি জানো আজকে ও বাড়িতে কি হয়েছে? মিন্টি দিদিকে সাজিয়ে গুজিয়ে আশ্রমে নিয়ে গেছে। তারপর একটা পিড়ির উপর বসিয়ে কত কিছু বলল, কত কিছু দিল। সবাইকে তো দিল না। ওকেই কেন দিলো?"
" আরে ওকে কুমারী হিসেবে পুজো করেছে।"
" এটা আবার কি পুজো?"
"শোন তোকে পরে ভালো করে বুঝিয়ে বলবো। এখন এটুকু জেনে রাখ যে বাচ্চা মেয়েদেরকে দেবী দুর্গা বা আদ্যা শক্তির প্রতীক হিসেবে মহাষ্টমীর দিন পুজো করা হয়। তার পা ধুয়ে নতুন পোশাক পড়িয়ে, ফুল চন্দন ধুপ , দীপ নৈবেদ্য দিয়ে পুজো করা হয়। এ পুজো অনেকদিনের। আজ থেকে ১২৬ বছর আগে বেলুড়মঠে স্বামী বিবেকানন্দ দুর্গাপুজোর সময় এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন। শোনা যায় এই পুজো আরো অনেক আগেও চালু ছিল। ওই যে স্বামীজি বেলুড়মঠে এই পুজো শুরু করলেন তারপর থেকে অনেক দূর্গা মন্ডপে বিশেষ করে আশ্রমে এই পুজো হয়। আজকে মিন্টি দিদিকে কুমারী হিসেবে পুজো করা হয়েছে।"
প্রীতিসার কাছে 'ছবিতে স্বামী বিবেকানন্দ' বইটা আছে। বেশ রংঙীন ছবি দিয়ে বইটার মধ্যে স্বামীজীর জীবনের নানা কথা বলা আছে। বাবা চলে যাবার পর ও নিজের বইয়ের তাক থেকে বইটা নামিয়ে একবার পড়তে শুরু করলো। বেলুড় মঠে প্রথমবারের দুর্গা পুজোর কথাও রয়েছে। রয়েছে সেই পুজোতে সারদা দেবীর উপস্থিতির কথাও। স্বামীজি সেবার নয় জন কুমারীর পূজা করেছিলেন।
প্রীতিসা ভাবতে লাগলো, মা দুর্গাও তো মেয়ে। মা দুর্গার পাশে মা লক্ষ্মী ,মা সরস্বতী রয়েছেন। তারাও তো মেয়ে। আবার কুমারী পুজোর সময় ও মেয়েদেরই পূজো করা হয়। তারমানে আমাদের চারপাশে মেয়েদের একটা গুরুত্ব আছে। ভাবতে ভাবতেই ওদিক থেকে মা ডাক দিয়েছে," তৈরি হয়ে নে মন্ডপে যাবো!"
তাই আপাতত আর ভাবনাটা বেশি দূর এগোলো না। কিন্তু মাথায় একটা প্রশ্ন এসে গেল! তাহলে বাবা আর মা মাঝেমধ্যেই টিভি দেখে আর বলে , রাস্তায় ঘাটে মেয়েদের উপর খুব খারাপ ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় নাকি মেরেও ফেলে। বছরে একবার মেয়েদের পুজো করে, আবার সারা বছর ধরে মেয়েদের উপর অত্যাচারও করে। এটা কেন? বাবার কাছে এই প্রশ্নটা তুলতেই হবে। আপাতত বরং নতুন জামা কাপড় পড়ে মন্ডপে যাওয়া যাক।
কুমারী পূজা
কনখল, শ্রীশ্রী আনন্দময়ী আশ্রম
চিত্র সৌজন্যে: দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
Comments :0