Editorial

ভোটের রামনবমী, বিভাজনের প্রতিযোগিতা

সম্পাদকীয় বিভাগ

‘জয় বাংলা’ এবং ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি যেন মিলেমিশে একাকার। প্রতিবছরই যে ছবি দেখতে বাংলার মানুষ এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, ভোটের মুখে সেই রামনবমীতে হুঙ্কার বাড়বে না তা হয় কি করে? রাজ্য রজনীতিতে এটাই এখন দস্তুর। এ বছর তাই ভোটের রাজনীতিতে জাঁকিয়ে নামলো বিজেপি এবং তৃণমূল। অস্ত্রের মিছিল, আর তাতে তৃণমূল-বিজেপি দু‘দলই একাকার। উগ্র সংখ্যালঘু বিদ্বেষী স্লোগান ও অস্ত্র প্রদর্শনে  কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। হিন্দু ভোটে ভাগ বসনোর দু’দলেরই অদম্য কারসাজি। রামনবমীর দু’টি দলেরই মিছিলে রামকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়েছে এমন দৃশ্য রাজ্যের বহু জায়গায়। স্থানীয় মানুষ বলছেন, কোন মিছিল তৃণমূলের, কোনটা বিজেপি’র বোঝা মুশকিল। মনে হয় দু’টো একই দল। চমকপ্রদ যা তা হলো রাজ্যে রামনবমীর মিছিলে তৃণমূল এবং বিজেপি’র নেতাদের দেখা গেল একসঙ্গেও বহু জায়গায়। বলাই বাহুল্য অস্ত্র সমেত। 
এতদিন এই ধরনের মিছিলে সাধারণত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপি’র উদ্যোগেই দেখে এসেছেন মানুষ, যেখানে উগ্র সংখ্যালঘু বিদ্বেষী স্লোগান ও অস্ত্র প্রদর্শন থাকেই। ভোটের বাজারে তৃণমূলই বা পিছিয়ে থাকে কেন? অতএব অস্ত্রসম্ভারে পরিপূর্ণ রামনবমী শোভাযাত্রার সাক্ষী হয়েছে রাজ্য। হাইকোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজ্যে দিকে দিকে রামনবমীর মিছিলে দেদার অস্ত্রের আস্ফালন দেখলেন মানুষ।

অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে নিষেধ করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। সেই রায়কে অমান্য করেই রাজ্য জুড়ে ভোটের মুখে মিছিল হয়েছে। মিছিলের সামনে দেখা গিয়েছে দু’দলের প্রার্থীদেরও। কোথায় নির্বাচন কমিশন, কোথায় বা প্রশাসন!
এ রাজ্যের যে রামনবমীকে ঘিরে একসময় সমন্বয়ের সংস্কৃতি ছিল রাজ্যে। আর সেটাই এখন মেরুকরণের রাজনীতিতে  ভোটে জেতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করার প্রতিযোগিতা। তা শুধু যে রামনবমীতেই সীমাবদ্ধ এমনটা নয়। এ রাজ্যে যেকোনও উৎসবই হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যম।  নির্বাচনের আগে ‘হিন্দুত্বের’ জিগির তুলতে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি— দু’পক্ষই মরিয়া। কে কত বড় হিন্দু— তা নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। আগে প্রতি রামনবমীতেই ছবি বা প্রতিমা নিয়ে এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতেন সাধারণ মানুষ। আর রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে হিন্দু, মুসলিম সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ শোভাযাত্রা দেখতেন, জল-বাতাসা দিতেন।  বাংলার এই সংস্কৃতি বদলে দিয়েছে মেরুকরণের রাজনীতি। আরএসএস এবং বিজেপি ও তৃণমূলের সৌজন্যে বাংলার রামনবমী এখন কার্যত এক রণক্ষেত্রের চেহারা নিচ্ছে, অথবা ভয়ের আবহ পরিণত করছে অনেক জায়গায়। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ সহ বেশ কিছু জায়গায় ছড়িয়েছে গোষ্ঠী সংঘর্ষ। আহত হয়ে একাধিক মানুষ ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। তাঁদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেছেন সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দ।
প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয় যে, তাহলে প্রশাসন কোথায়? রাজ্যে তৃণমূল সরকারে আসীন হওয়ার পর থেকে আরএসএস’র মার্কামারা কায়দায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে রাজ্যে। বারবার হচ্ছে গোষ্ঠী সংঘর্ষ, দাঙ্গা। হাজিনগর থেকে আসানসোল, সামশেরগঞ্জ থেকে রঘুনাথগঞ্জ— সর্বত্র প্রশাসন হাত গুটিয়ে থেকেছে। দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কতজনকে, কোথাও তার তথ্য নেই। বস্তুত আরএসএস’র সব কর্মসূচিকেই নিজে দায়িত্ব নিয়ে রূপায়ণ করে চলেছে তৃণমূলের সরকার। আসানসোলে প্রাণঘাতী দাঙ্গায় দায়ী করেছিলেন বিজেপি‘র যে সাংসদকে তাকেই দলে টেনে নিয়ে বিধায়ক, এমনকি মন্ত্রী করে দেন মমতা ব্যানার্জি! 
আসলে মেরুকরণের মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষকে। দুই দলের থেকেই পরিত্রাণ চাইছেন বাংলার মানুষ। যে কারণে বাংলা বাঁচানোর ডাকে ভোট লড়ছে বামপন্থীরা।

Comments :0

Login to leave a comment