নয়ডায় গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকদের মুক্তির দাবিতে জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যান সিপিআই(এম)’র প্রতিনিধিদল। তবে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকারের পুলিশ বারংবার তাঁদের বাধা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে দু’বার ধরনায় বসেন সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। বাধ্য হয়ে তাঁদের সঙ্গে জেলাশাসক দেখা করেন। আটক শ্রমিক নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে সমস্ত বিক্ষোভরত শ্রমিকের নিঃশর্ত মুক্তি এবং সমস্ত দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, জানিয়েছেন বেবি।
সোমবারের তীব্র বিক্ষোভের পর ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের বেপরোয়া ধরপাকড় শুরু করেছে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার। বৃহস্পতিবার সকালে গৌতম বুদ্ধ নগরের সিআইটিইউ জেলা সম্পাদক রাম সারথকে আটক করা হয়েছে। তাঁর বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করলেই যোগী সরকারের পুলিশ উত্তর এড়িয়ে গিয়েছে। রাজ্যের একাধিক সিআইটিইউ নেতাকে ঘরবন্দি করে তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নয়ডা সহ আশপাশের অঞ্চলে কর্মরত অন্তত ৪০০ শ্রমিক জেল হেপাজতে রয়েছেন। বিনা নোটিসে রাতের অন্ধকারে বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। রাজ্যজুড়ে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
আটক ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে, শুক্রবার সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপমের সঙ্গে দেখা করতে যান। বেবির পাশাপাশি প্রতিনিধি দলে সিপিআই(এম) সাংসদ অমরা রাম, ভি শিবদাসন, এ এ রহিম এবং পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য অরুণ কুমার উপস্থিত ছিলেন। পরে সাংসদ জন ব্রিটাস এবং পার্টির দিল্লি রাজ্য সম্পাদক অনুরাগ সাক্সেনাও যোগ দেন।
প্রথমে নয়ডার সেক্টর ৮-র বনস বল্লি বাজারে আটক শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সিপিআই(এম)’র প্রতিনিধি দল দেখা করার পরিকল্পনা করেন। তবে দিল্লি থেকে নয়ডায় ঢোকার সময় ‘চীরা সীমান্তে’ উত্তর প্রদেশ সরকারের পুলিশ তাঁদের গাড়ি আটকে ফিরে যেতে বলে। পুলিশের যুক্তি, এলাকা ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ হওয়ায় কোনও ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি’-কে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এর প্রতিবাদে গাড়ি থেকে নেমে সিপিআই(এম) সাংসদ অমরা রাম প্রশ্ন তোলেন, ‘‘এটা কি জরুরি অবস্থা চলছে?’’
ঘটনাস্থলে নয়ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বাদানুবাদের সময় বেবি বলেন, ‘‘চার শতাধিক শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বহু নেতার কোনও খোঁজ নেই। পুলিশ নির্মমভাবে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। সিআইটিইউ জেলা সম্পাদককে দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছে। এভাবে শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।’’
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, তাঁরা জেলা শাসকের সঙ্গে দেখা না করে ফিরবেন না। পুলিশ বাধা দিলে তাঁরা রাস্তার উপরই ধরনায় বসে পড়েন। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে বেবি, অমরা রাম, শিবদাসন, রহিম ও অরুণ কুমার ধরনায় বসে থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, আগের দিন থেকেই জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করা হলেও তিনি তা বারেবারে এড়িয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিকদের স্বার্থকে খর্ব করতে পরিকল্পিতভাবেই প্রশাসন এই ‘এড়িয়ে যাওয়া’ নীতি অবলম্বন করছে।
পুলিশের তরফে জানানো হয়, জেলাশাসক তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। তবে তাঁর প্রতিনিধি তাঁদের সঙ্গে এসে দেখা করে কথাবার্তা বলে যাবেন। এই প্রস্তাবে সিপিআই(এম) নেতারা অস্বীকার করে তাঁদের দাবিতে অনড় থাকেন। বাধ্য হয়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেলাশাসক তাঁর ‘ক্যাম্প অফিসে’ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করবেন।
কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়ে বেবি সহ অন্যান্যদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানো হলেও জেলাশাসক উপস্থিত হননি। এই ঘটনাকে বেবি ‘প্রতারণা’ বলে কটাক্ষ করেন। ফলে জেলাশাসকের দপ্তরের সামনে দ্বিতীয়বারের মতো তাঁরা ধরনায় বসেন। এই সময় সিআইটিইউ নেতা আনিয়ান পি ভি এবং বিরেন্দ্র গৌরকে উত্তর প্রদেশ পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। বেবি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘‘আনিয়ান, গৌর ও রাম সারথ— এই তিন জনকে এখানে হাজির করতে হবে। তারপরই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। আমরা এখানে বসেই থাকব, যতক্ষণ না তাঁদের সামনে আনা হচ্ছে।’’
এই দ্বিতীয় ধরনা প্রথমটির তুলনায় অনেক বেশি তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু প্রশাসনিক বাধার প্রতিবাদ নয়, বরং সরাসরি জেলা প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে উপস্থিত সাংসদরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। ভি শিবদাসন দাবি করেন, জেলাশাসক ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলে দেখা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং সেই কথোপকথনের রেকর্ডও তাঁদের কাছে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে— এটি ‘ইচ্ছাকৃত অপমান’ বলেই অভিযোগ তোলেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
প্রতিনিধিদলের তরফে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, এ ধরনের আচরণ চলতে থাকলে সংসদে বিশেষাধিকার লঙ্ঘনের নোটিস আনা হবে। কারণ, সাংসদদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করা মানে জনগণের প্রতিনিধিত্বকেই অস্বীকার করা। ক্রমশ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যেখানে প্রশাসনের পক্ষে আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ধরনাস্থলে স্থানীয় শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরাও ভিড় জমাতে শুরু করেন, ফলে চাপ বহুগুণ বাড়তে থাকে। এই চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত শীর্ষ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তারা ঘটনাস্থলে এসে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর প্রশাসন পিছু হটে। অবশেষে আটক আনিয়ান পি ভি, বিরেন্দ্র গৌর এবং রাম সারথকে প্রতিনিধিদলের সামনে এনে মুক্তি দেওয়া হয়। সিপিআই(এম) প্রতিনিধিদলকে জেলা শাসকের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতিও দেওয়া হয়।
তিন সিআইটিইউ নেতার নিঃশর্ত মুক্তিকে ‘আংশিক সাফল্য’ বলে উল্লেখ করে বেবি বলেন, সংগঠিত প্রতিবাদই একমাত্র পথ। আজ তা আবারও প্রমাণ হলো। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। শুধুমাত্র কয়েকজনকে মুক্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যে দমননীতি চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
বেবি আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে ভয় সৃষ্টি করে শ্রমিক আন্দোলন ভাঙার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘‘শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং মর্যাদার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। এর জবাবে যদি লাঠি, গ্রেপ্তারী আর নিখোঁজ করে দেওয়ার মতো পদ্ধতি নেওয়া হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ঙ্কর সংকেত।’’
শুক্রবার সিআইটিইউ’র সাধারণ সম্পাদক এলামারাম করিম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘নয়ডার শিল্পাঞ্চলে চলতে থাকা এই আন্দোলন এখন শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই— এটি ক্রমশ গণতান্ত্রিক অধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় দমননীতির বৃহত্তর সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে।’’
এদিন উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজবাদী পার্টি ও আম আদমি পার্টি আটক শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে যোগী সরকারের পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও শোনা গেছে।
NOIDA LABOR LEADERS RELEASED
পুলিশি বাধা ভেঙে নয়ডায় দু দফা ধরনা,চাপের মুখে মুক্তি ৩ শ্রমিক নেতার
×
Comments :0