রাজ্যে দু’দফায় ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলেছেন, একজন বৈধ ভোটারও যাতে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এবং একজন অবৈধ ভোটারও যাতে ভোটদানের সুযোগ না পান তার জন্যই এসআইআর। অতি উত্তম কথা। জ্ঞানেশের এই মন্তব্য একশোভাগ সত্য। এখানে দ্বিমত পোষণের কোনও সুযোগ নেই। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা বা ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হলেও এটা সত্য এই জ্ঞানেশের নেতৃত্বেই এই রাজ্যের ৬০ লক্ষাধিক মানুষের ভোটাধিকারকে সন্দেহের তালিকায় রেখে কমিশন সাড়ম্বরে নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। সকল বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে নির্বাচন ঘোষণা করে কমিশন কোন নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করল?
নির্বাচন কমিশন যারা পরিচালনা করেন সেই কমিশনাররা ঠিক করেন কীভাবে কত সহজে, নির্বিঘ্নে ও নিরুদ্বেগে দেশের প্রত্যেক বৈধ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করা যায়। বৃহত্তর অর্থে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব বৈধ ভোটারদের সব রকমভাবে সাহায্য করা ও পাশে থাকা। নির্বাচন সম্পর্কে, ভোটদান সম্পর্কে তাদের অবহিত ও উৎসাহিত করা। তাছাড়া সমস্ত বৈধ ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে যায়, ভোট দেয় তার যথাযথ পরিবেশ তৈরি করাও কমিশনের কাজের মধ্যে পড়ে। যত বেশি মানুষ ভোটে অংশ নেবেন গণতন্ত্র তত মজবুত হয়।
এই প্রসঙ্গে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। কমিশন হবে মানুষের সহযোগী, বন্ধুর মতো। ভোট হবার পদ্ধতি হবে অত্যন্ত সহজ ও সরল যাতে শিক্ষায় চেতনায় পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষও তাদের বৈধতা প্রমাণ করতে পারেন। এমন পদ্ধতি বাঞ্ছনীয় নয় যাতে বৈধ নাগরকিরা আতান্তরে পড়েন। যেসব নথি সহজলভ্য নয় সেগুলি বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়। সেই নথিই বাধ্যতামূলক হোক যেগুলি সকলের আয়ত্তের মধ্যে থাকে। কমিশনের অঘোষিত উদ্দেশ্য যদি হয় সরকার ও শাসক দলের বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষিত করা তাহলে এমন জটিল পদ্ধতি অনুসরণ করবে যাতে অনেক বৈধ ভোটারকে বাতিল করা যায়। এরাজ্যে এসআইআর যে সেটাই হয়েছে। কয়েক মাস ধরে রাজ্যবাসীকে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রেখে ভীতি ও আতঙ্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শেষে দুর্লভ কাগজ জোগাড় করতে না পেরে লক্ষ লক্ষ ভোটার বৈধতা হারিয়ে বিবেচনাধীন রয়েছেন। সেই সূত্রে তাদের নাগরিকত্ব নিয়েও সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এইভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে অকারণে ভয় দেখিয়ে, আতঙ্কের আবহ তৈরি করে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবার নৈতিক বা প্রশাসনিক অধিকার কমিশনের থাকতে পারে না।
মানুষকে বিড়ম্বিত না করে, যথেচ্ছ হয়রানি না করে নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি কমিশনের কাজ। অবাস্তব ও অযৌক্তিক নিয়মের ফাঁদে ফেলে ৬০ লক্ষাধিক মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়াকে ন্যায়সঙ্গত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন বলা যায় না। বরং কমিশনের অক্ষমতা, অযোগ্যতা, এমনকি অপদার্থতার ইঙ্গিত বহন করে।
মনে রাখতে হবে নির্বাচন কমিশন বা কমিশনাররা সরকার বা শাসক দলের কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাদের দায়বদ্ধতা সংবিধানের কাছে। বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার খর্ব করে এবং বহু বৈধ ভোটারকে প্রার্থী হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোনও নির্বাচন হতে পারে না।
Editorial
প্রশ্ন যখন বৈধতা
×
Comments :0