Adani electricity

কাটোয়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমি আদানিদের হাতে যাচ্ছে?

রাজ্য

এনটিপিসি-কে তাড়িয়ে কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য অধিগৃহীত জমি আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে চাইছে নবান্ন। সূত্রের খবর, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে অধিগ্রহণ করা এই বিপুল জমি গৌতম আদানির হাতে তুলে দিতে গোপনে না কি বৈঠকও হয়ে গিয়েছে নবান্নে! এখন এই গোষ্ঠীর হয়ে এনটিপিসি’র সঙ্গে রাজ্যের তৃণমূল সরকার কথা চালাচ্ছে, কত টাকা পেলে এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জমি আদানিদের হাতে ছেড়ে চলে যাবে। 
আশঙ্কায় এখানকার জমিদাতারা। শিল্পের জন্য তাঁরা স্বেচ্ছায় ৫৫৬ একর জমি দিয়েছিলেন সরকারকে। তারপর এনটিপিসি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আরও ১৯৮ একর জমি কিনেছিল। এই জমি দেওয়ার পেছনে একটাই কারণ ছিল, এখানে শিল্প হলে কর্মস্থান হবে, বাজার ও গঞ্জ গড়ে উঠবে। কিন্তু আদানিরা যদি এই জমি নেয়, তাহলে সেই জমি শিল্প তৈরির জন্য ব্যবহার না করে প্রোমোটার হিসাবে আবাসন গড়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করবে, এমনই আশঙ্কায় জমিদাতারা। এনটিপিসি’র ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও ১১ বছরে কেন একটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা গেল না, তা নিয়ে সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছেন কাটোয়ার কৃষকরা। কাটোয়ার জমির সঙ্গে আদানির নাম জুড়তেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। কৃষকদের বক্তব্য, সিঙ্গুরে টাটাদের তাড়িয়ে এবার কাটোয়া থেকে এনটিপিসি-কে তাড়াতে চাইছেন মমতা ব্যানার্জি।


২০০৫ সালে কাটোয়ায় তাপবিদ্যুৎ গড়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় রাজ্য সরকার। তারপর কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ হলো, পাঁচিল দিয়ে সেই জমি ঘেরা হলো, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বর্ধমান থেকে কাটোয়া ন্যারোগেজ থেকে ব্রডগেজ রেল লাইন তৈরি করে দেওয়া হলো। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করবে বলে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে অপেক্ষা করে রইল এনটিপিসি। হাজার হাজার মানুষের প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান রাজ্য সরকার এই কাজে কোনও সহযোগিতা করল না এনটিপিসি-কে। এরপরও কি এলাকার জমিদাতা, যুবকরা প্রত্যাশা করেন যে, মমতা ব্যানার্জির সরকার তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন? এমনই আফশোস জমিদাতা শিশির ঘোষ, নবকুমার ঘোষ, হরিশঙ্কর চন্দ্রদের।
এখন কাটোয়ার মানুষ মমতা ব্যানার্জিকে বলছেন, ‘‘ফিরিয়ে দাও আমাদের ১১টা বছর।’’ কাটোয়ার মানিক ঘোষ, গোরাচাঁদ সাহারা বলছেন, ‘‘রাজ্যে কোনও নতুন শিল্প নেই, তাই কর্মসংস্থানও নেই। এখানকার ছেলেরা দলে দলে চলে যাচ্ছে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে কাজের সন্ধানে।’’ 
কাটোয়াতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য ৫৫৬ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। প্রায় ১ হাজারের বেশি কৃষক এই জমি দিয়েছিলেন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে। মূলত কোশিগ্রাম, শ্রীখণ্ড ও গোয়াই পঞ্চায়েত এলাকার এই জমি অধিগ্রহণ করে বামফ্রন্ট সরকার। এই জমির জন্য কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করেই দাম দেওয়া হয়েছিল। তাঁরাও স্বেচ্ছায় শিল্পের জন্য জমি দিয়েছিলেন। ক্ষতিপূরণ কত দেওয়া হবে, তা ঠিক করতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি তৈরি হয়। খুবই আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও এই জমি অধিগ্রহণের সময়ে তৃণমূল, বিজেপি সহ যত বিরোধী দল ছিল, জোট বেঁধে বাধা দিয়েছিল। নকল ‘কৃষি জমি রক্ষা কমিটি’ গড়ে এই তৃণমূল-বিজেপি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়তে বাধা দেয়। কিন্তু সেই বাধায় বিভ্রান্ত না হয়ে কৃষকরা স্বেচ্ছায় জমির মূল্য চেকে নিয়েছিলেন। শুধু কৃষক নয়, খেতমজুররা যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন, তার জন্য ২০টি বুথে সার্ভে করে দেড় হাজার খেতমজুরের নাম চিহ্নিতও করা হয়। তাঁরাও ক্ষতিপূরণ পেতেন, কিন্তু তার মধ্যেই বামফ্রন্ট সরকার চলে গিয়ে তৃণমূলের সরকার ক্ষমতায় আসে। 


তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সেই জমিতে শিল্প যাতে না গড়ে ওঠে, তার জন্য সবরকম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি করা হয়। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠা নিয়ে এলাকার জমিদাতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে স্বপ্ন ছিল, তৃণমূল ক্ষমতায় এসে তাতে জল ঢেলে দেয়। মানুষ যে সেই সময়ে শিল্পের ডাকে সম্মত হয়েই জমি দিয়েছিলেন, তার প্রমাণ— ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামপন্থীরা কোশিগ্রাম ও গোয়াই পঞ্চায়েতে তৃণমূল ও বিজেপি-কে হারিয়ে জয়ী হয়। মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাও বেড়ে যায় অনেকটা। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেও এই এলাকায় তোলাবাজিই করেছে, কিন্তু শিল্পের জন্য এক কোদাল মাটিও কাটতে পারেনি। এনটিপিসিও কার্যত হতাশ শাসক দলের ভূমিকা দেখে। 
এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ায় অন্যতম সমস্যা ছিল রেলপথ। বর্ধমান–কাটোয়া ন্যারোগেজ থেকে ব্রডগেজ না করলে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা কীভাবে আসবে রানীগঞ্জ, আসানসোল থেকে? তাই ২০০ কোটি খরচ হবে রেললাইন বদলাতে, সেই লক্ষ্য নিয়েই এনটিপিসি ১১০ কোটি টাকা দেয় রেলকে। বাকি টাকা দেয় বামফ্রন্ট সরকার। কাটোয়া হাসপাতালের উন্নয়নেও এনটিপিসি টাকা ঢালে মানুষের চিকিৎসার জন্য। ৩টি পঞ্চায়েত এলাকায় পানীয় জলের জন্য ৩৮টি গভীর নলকূপ, সোলার লাইট বসায় এনটিপিসি। সেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর কোনও সহযোগিতা করেনি। গত ১১ বছরে তারপর আর কোনওভাবেই এই শিল্পের নির্মাণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে সম্মতি দেয়নি রাজ্য। সূত্রের খবর, এতেই ক্ষুব্ধ এনটিপিসি’ও।  
এখানে শুধু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রই হতো না, তার অনুসারী হিসাবে সিমেন্ট শিল্প এবং সুগার মিলও গড়ে উঠত। শিল্পতালুকও গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এনটিপিসি জমিদাতাদের পরিবারের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতেও শুরু করেছিল। তাঁদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় একটা শিল্পবিরোধী সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়। কোশিগ্রামের কৃষক দেব কুণ্ডু আক্ষেপ করে বলেছেন, মানুষ কী ভুল করেছে তৃণমূলকে ভোট দিয়ে! যদি এখানে শিল্পগুলো হতো, তাহলে এখানকার ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি বদলে যেত। শ্রীখণ্ডের নবকুমার ঘোষ বলেছেন, ‘‘আমরা জেনেছি, এনটিপিসি’র দেশে ২৭টি প্রোজেক্ট আছে। শুধুমাত্র তৃণমূল সরকার ক্ষমতাই থাকার জন্যই এই শিল্পটা হতে পারল না। এখন আদানিদের এনে এই জমিতে প্রোমোটারিতে মদত দেওয়া হচ্ছে।’’  


স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতা কমল ঠাকুর অভিযোগ করেছেন, কাটোয়ার বিধায়ক রবি চ্যাটার্জি সেই সময় বিরোধিতা করেছিলেন, যাতে এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে না উঠতে পারে। পরে তিনি তৃণমূলের বিধায়ক হন। কিন্তু এলাকায় শিল্প গড়ে তোলার জন্য তাঁর কোনও ভূমিকা কাটোয়ার মানুষ দেখতে পাননি। এলাকায় তোলাবাজিকেই মদত দেওয়া হয়েছে। এখানে যাতে তাপবিদ্যুৎ সহ একাধিক শিল্প গড়ে উঠতে পারে, তার জন্য ডিওয়াইএফআই লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছে শুরু থেকে। জানিয়েছেন সংগঠনের পূর্ব বর্ধমান জেলার সম্পাদক অয়নাংশু সরকার। ২০১৫ সালে এখানেই থার্মাল পাওয়ার গড়তে সরকারের উপর চাপ বাড়াতে শুরু করে ছাত্র-যুবরা, সমাবেশ সংগঠিত করে তারা। বক্তা ছিলেন মহম্মদ সেলিম। মিছিল হয় কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গেটের সামনে। প্রায় ২০০০ বাইক সেই মিছিলে অংশ নেয়। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের রাজ্য সভানেত্রী মিনাক্ষী মুখার্জি সহ অনেকেই। আরও একাধিকবার ছাত্র-যুব সমাবেশ হয়েছে এখানে। কিছু দিন আগেও ডিওয়াইএফআই এবং এসএফআই ওই মাটিতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে প্রতীকী শিলান্যাসও করে। কিন্তু সেই জমি আদানিদের হাতে যাওয়ার কথা ছড়াতেই নতুন করে ক্ষোভ দানা বাঁধছে কাটোয়াতে।

 

 

Comments :0

Login to leave a comment