Md Salim in dharna mancha

বছর পার হয়ে গেলেও কমেনি নিয়োগ চেয়ে আন্দোলনের তেজ

রাজ্য

আর কতদিন, নতুন বছরেও কি একইভাবে যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে? মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন তুললেন বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা। বছরের প্রথম দিন যখন মহানগর মেতেছে খুশির আমেজে, তখন ন্যায্য অধিকারের দাবিতে এই শহরেই একইভাবে অবস্থানে শামিল তাঁরা। মাসের পর মাস যায়, বছরের পর বছর। হয়তো শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু থামে না আন্দোলনের তেজ। বরং নিয়োগের দাবিতে প্রতিদিন আরও জোরদার ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে তা। রবিবার ১ জানুয়ারিও তার অন্যথা হয়নি। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে সোচ্চার হয়ে ওঠে গোটা চত্বর। এদিন সেই চাকরিপ্রার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বললেন, ‘এই যোগ্যদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়োগ করব আমরাই। স্কুলকে শিক্ষক শূন্য করে, রুগ্‌ণ করে দিয়ে স্কুল ভবন-চত্বরকে জমি হাঙরদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত আমরা রুখবই।’
কলকাতার শহীদ মিনারের অদূরে কোনমতে টাঙানো প্লাস্টিকের ছাউনির নিচেই কেটে গেল অপেক্ষার আরও একটা বছর। গরমকাল, বর্ষা পেরিয়ে এখন শীতের মাঝামাঝি। পরিবারের বৃদ্ধ বাবা মা, অসহায় ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলতে না পেরে অসংখ্য যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা নেমে এসেছেন রাস্তায়। পরীক্ষায় পাশ করেও একটা হকের চাকরির আশায় ৭-৮ বছর ধরে দিন গুণছে শ’য়ে শ’য়ে পরিবার। আর ওদিকে ভুয়ো নিয়োগপত্র বিলি করে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ হয়েছে শাসক দলের নেতা মন্ত্রীদের। মামলার পর মামলা চলছে হাইকোর্টে। কিন্তু কবে হবে সুরাহা? উত্তরে সরকার বদলের দিকেই এখন ইঙ্গিত করছেন চাকরিপ্রার্থীরা। গত ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের পর ফের এদিন মহম্মদ সেলিম পৌঁছান মাতঙ্গিনী মূর্তির নিচে চাকরিপ্রার্থীদের ধরনা মঞ্চে। পাঁচটি মঞ্চে গিয়েই তিনি কথা বলেন চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে।


মহম্মদ সেলিম বলেন, ২০২২ চলে গেছে, ২০২৩ ইংরেজি ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন আজকে। কিন্তু এর কত আগে থেকে এই আন্দোলন চলছে। সেই বঞ্চিতই রয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এর মধ্যে কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। আসলে শিক্ষাকেই তুলে দিতে চাইছে সরকার, শাসক দল। তার বদলে টাকার পাহাড় তৈরি করায় নজর দিয়েছে। শিক্ষক ছাড়াই কত স্কুল চালানো হচ্ছে। স্কুল ভবন ও তার চত্বরকে জমি হিসাবে দেখছে জমি হাঙররা। সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে স্কুল, প্রতিষ্ঠান তুলে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। ভারতের সংবিধানে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এর একটা বড় অংশ প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে আর এগতে পারছে না। কেন পারছে না, কেন তাদের আরও শিক্ষার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না, কেন তারা স্কুলের বাইরে চলে যাচ্ছে তা দেখতে হবে। আগে তো এই অবস্থা ছিল না। কেন সেসব পার্লামেন্টে আলোচনা হবে না।
আসলে বিদেশিদের হাতে, পুঁজিপতিদের হাতে শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বলে মন্তব্য করে মহম্মদ সেলিম বলেন, এই অবস্থায় মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলি কি করবে। তাদের শিশুদের শিক্ষার কি ব্যবস্থা হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ফাইভ-স্টার স্কুল হচ্ছে আর সেই সরকারেরই চক্রান্তে সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলি উঠে যাচ্ছে। তাই একদিকে স্কুলগুলিকে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষক শূন্য করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ভুয়ো নিয়োগপত্র দিয়ে পকেট মোটা করছে। এখন বদলির ক্ষেত্রেও টাকা নিচ্ছে। টাকা তুলছে পাড়ায় পাড়ায়। আর তরুণদের যৌবনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে এই লোভ, লালসা, দুর্নীতি, শিক্ষা বিরোধী মনোভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। সমস্ত উৎসব থেকে বঞ্চিত থেকে অধিকার রক্ষার ধরনা মঞ্চে আন্দোলন করছেন তাঁরা। ওঁদের পাশে আমরা আছি। যোগ্যদের নিয়োগ করবো আমরা। 


এদিন ধরনামঞ্চে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্ত, বিকাশ ঝা প্রমুখ সিপিআই(এম) নেতৃত্ব। ইন্দ্রজিৎ ঘোষ বলেন, সোজা কথা হলো যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ করতে হবে। সরকারকে আমরা বাধ্য করবো নিয়োগ করতে। ২০২৩-এর বার্তা এটাই। ২০২২ সালে চাকরি চোররা ধরা পড়েছে, এবার ২০২৩ সালে নিয়োগ দিতে হবে। এদিন পাঁচটি ধরনামঞ্চ ছিল স্লোগানে স্লোগানে সোচ্চার। একটি মঞ্চে রয়েছেন আপার প্রাইমারি টেট চাকরিপ্রার্থীরা যাঁদের ২০১৫ সালে পরীক্ষা হয়ে ইন্টারভিউ হয়ে গিয়েছে ২০১৯ সালে, কিন্তু নিয়োগ হয়নি। অবিলম্বে মেধা তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এই চারকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, স্কুলে স্কুলে শিক্ষক নেই, অথচ ছাত্র রয়েছে। যেমন মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জের একটি স্কুলে ৭৭২ জন ছাত্র, কিন্তু শিক্ষক ১ জন। আবার মালদার কালিয়াচকের একটি স্কুলে ২১৯ জন ছাত্র আছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। ২ জন প্রাইমারি শিক্ষককে দিয়ে স্কুল চালানো হচ্ছে। এরকমই ৫০টি স্কুলের তালিকা চাকরিপ্রার্থীরা প্রকাশ করেছেন। 


তাঁদের ধরনামঞ্চে রয়েছে একটি ভিনাইল বোর্ড। তাতে মার্কার দিয়ে লেখা- শিক্ষক শূন্য শ্রেণিকক্ষ। চাকরিপ্রার্থীদের কারো পোশাকের ওপর কাগজে লেখা— আমরা শিক্ষার্থী, কারো পোশাকে লেখা আমরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, আবার কারো গায়ে লেখা- আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক। কারো কারো পোশাকে লেখা- আমরা স্বজনহারা। তার পাশের পাশের মঞ্চে অবস্থানে রয়েছেন রাজ্য সরকারের গ্রুপ ডি পদের চাকরি প্রার্থীরা। অপর মঞ্চে রয়েছেন ২০১৪ সালের প্রাইমারি টেট নট ইনক্লুডেড চাকরি প্রার্থীরা। এছাড়া একটি মঞ্চে আছেন স্কুলের গ্রুপ সি, ডি চাকরিপ্রর্থীরা। অন্যদিকে আপার প্রাইমারি টেট চাকরিপ্রার্থী যাঁদের ইন্টারভিউ হয়নি, তাঁরাও রয়েছে অপর একটি ধরনা মঞ্চে। চলছে রিলে অনশন। দীর্ঘ ৮ টি বছর চলে গিয়েছে তাঁদের চাকরির দাবিতে। মুখ্যমন্ত্রী দুর্দশার কথা শোনেননি। অবিলম্বে গেজেট মেনে সমস্ত আপডেট সিটে নিয়োগের দাবি তুলেছেন তাঁরা।  
 

Comments :0

Login to leave a comment