দীর্ঘ তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় যখন গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালাল আমেরিকা। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, 'আত্মরক্ষার্থে' তারা ইরানের মিসাইল সাইট এবং মাইন পুঁতে রাখার চেষ্টায় থাকা নৌকোগুলিকে নিশানা করেছে। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইরানের বাহিনীর তরফ থেকে আসা হুমকির হাত থেকে নিজেদের সেনাদের রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সংযম বজায় রেখেই মার্কিন সামরিক বাহিনী নিজেদের বাহিনীকে রক্ষা করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর বন্দর আব্বাসের কাছে এই হামলা চালানো হয়েছে। বন্দর আব্বাস হলো দক্ষিণ ইরানের একটি প্রধান নৌ ও বিমান ঘাঁটি।
ইরানের জাতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসের কাছে পরপর তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার পর স্থানীয় আধিকারিকরা তদন্ত শুরু করেছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে এবং শত্রু লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
এই হামলার ঠিক আগেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দাবি করেছিল যে, তারা পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় একটি শত্রু ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে এই মার্কিন হামলার বিষয়ে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নেতা মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর দেশবাসীকে এক বার্তায় জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের লড়াইয়ে পিছিয়ে আসার কোন জায়গা নেই। তিনি বলেন, ‘সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্র এবং রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষ তাদের সাহসী প্রতিরোধের মাধ্যমে শত্রুকে নতজানু হতে বাধ্য করেছে।’
এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাছের হেম্মাতিকে নিয়ে গঠিত একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে দোহায় অবস্থান করছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও সংঘাত অবসানের চুক্তি খুব শীঘ্রই হচ্ছে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহায় আলোচনা মূলত হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। একইসঙ্গে, একটি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ তহবিল ছাড়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
এদিকে, মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে বলেন, তিনি আশা করেন ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে তুলে দেবে। তিনি লেখেন, ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করে ধ্বংস করতে হবে, অথবা আন্তর্জাতিক সংস্থা 'অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন'-এর সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইরানেই তা ধ্বংস করতে হবে। যদিও ট্রাম্প যে কমিশনের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি ১৯৭৪ সালেই উঠে গিয়েছে।
এর আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রস্তাব দেন যে, শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক, বাহরাইন এবং জর্ডানের মতো দেশগুলির জন্য ইজরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার 'আব্রাহাম চুক্তি'তে (Abraham Accords) স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অংশেই এই চুক্তির বিষয় জানে না। সৌদি আরব ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো আগেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ইজরায়েলের সঙ্গে কোনভাবেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না।
গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাঝে এই জোড়া মার্কিন হামলা বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ফের বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
USA - IRAN
শান্তি আলোচনার মাঝেই ইরানে ফের মার্কিন হামলা, নিশানায় মিসাইল সাইট ও মাইন-বোট
×
Comments :0