editorial

হকার উচ্ছে‍দের নেপথ্যে

সম্পাদকীয় বিভাগ

পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-বিজেপি ক্ষমতা দখলের পর দু’দিনও অপেক্ষা করেনি। রাজ্যজুড়ে রেল স্টেশনে স্টেশনে হকার উচ্ছেদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রেল কর্তৃপক্ষ তথা কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকার। প্রত্যাশিতভাবেই রাজ্যে নব গঠিত শুভেন্দুর সরকার এবং অবশ্যই রাজ্য বিজেপি এই অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছে। রাজ্য সরকার শুধু সমর্থন করেই দায়িত্ব পালন করেনি, অভিযানে রেলকে সব রকমের সাহায্যও করছে। তেমনি স্টেশনের ভেতরে, প্ল্যাটফর্মের হকারদের পাশাপাশি স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় মূলত রেলের জমিতে থাকা হকারদের তুলে দিয়ে পুরো এলাকা ফাঁকা করতে চাইছে। অর্থাৎ রেল চত্বরে কোনও গরিব দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে হকারি করতে দেবে না বলে মোদী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রেল চত্বরে হকারি বা চলন্ত ট্রেনে হকারি কোনও মানুষেরই প্রত্যাশিত পেশা নয়। ক্রমবর্ধমান বেকারি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার জাঁতাকলে পড়ে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয় হকারি করতে। ব্যাপারটা এমন নয় যে অন্যত্র রুজি রোজগারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তা না করে রেলে হকারি করছেন। দেশের অর্থনীতি, সরকারের ব্যর্থতার পরিণতি হকার হওয়া। এর দায় পুরোপুরি সরকারের। সরকার সেই দায় স্বীকার না করে স্বৈরাচারী কায়দায় হকারদের উপর দমনপীড়ন চালিয়ে উচ্ছেদ করছে। গণতান্ত্রিক দে‍‌শে কোনও নির্বাচিত সরকারের অধিকার নেই রুজিহীন নাগরিকদের সৎপথে পরিশ্রম করে সামান্য রোজগারের সুযোগ কেড়ে নেবার। গণতন্ত্রে জমিদারতন্ত্র চলে না। গরিব মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাড়ানো সরকারের দায়িত্ব। সেটা যদি সরকার পালন করতে না পারে তাহলে তেমন সরকার অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়। গণতন্ত্রে মানুষ সরকার নির্বাচন করে কিছু বড়লোকের স্বার্থ দেখার জন্য নয়। সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে গরিব মানুষের রুটি রুজির বন্দোবস্তই নির্বাচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তা না করে গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে তাদের রুজি কেড়ে নিতেই সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিজেপি বাইরে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদা‍য়িক দল হলেও আদতে বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থবাহী দল। বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের টাকায় চলে এই দল। দেশের বাকি সব রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত অর্থ ও সম্পদের থেকে বহুগুণ বেশি ধনী বিজেপি। সাধারণ মানুষের দান বিজেপি নেয় না। দেশের সব কর্পোরেটের দেওয়া কোটি কোটি টাকায় বিজেপি চলে রাজকীয় ঘরানায়। যাদের টাকায় বিজেপি পুষ্ট এবং যাদের টাকায় ঠাটবাট তাদের স্বার্থ দেখাই বিজেপি’র প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। তাই দেশের যাবতীয় সম্পদ যথেচ্ছ মুনাফার জন্য কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। মোদী সরকারের মানিটাইজেশন প্রকল্পের অন্যতম অঙ্গ রেলের জমি। রেল চায় স্টেশন চত্বর, প্ল্যাটফর্ম, খালি জায়গা, অব্যবহৃত জমি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিতে। তাতে রেলের যেমন আয় বাড়বে তেমনি ব্যবসায়ীদেরও মুনাফার নতুন বন্দোবস্ত হবে। শিয়ালদহ স্টেশনকে ইতিমধ্যেই আধুনিক শপিং মলে পরিণত করা হয়েছে। বড় বড় কোম্পানির ব্রান্ডেড পণ্য ও খাবার বিক্রি করার জন্যই সব হকারদের তাড়াতে হবে। হকাররা অতি কম দামে খাবার ও নানা পণ্য বিক্রি করে। ফলে সাজানো দোকানের উচ্চ মূল্যের ব্র্যান্ডেড পণ্য বিক্রি হবে না। অতএব হকার তুলে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে বসিয়ে বড় কোম্পানির দামি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা হচ্ছে। বৃহৎ পুঁজির সেবাদাসত্বের তাগিদের হকার উচ্ছেদে মেতেছে বিজেপি সরকার।

Comments :0

Login to leave a comment