রাজ্যগুলির অধিকারের পক্ষে লড়াই কেবল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষার লড়াই নয়। দেশের সংবিধান এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যও এই লড়াই জরুরি।
বৃহস্পতিবার মাদুরাইয়ে সিপিআই(এম) পার্টি কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আলোচনা সভায় এ কথা বলেছেন পলিট ব্যুরোর কোঅর্ডিনেটর প্রকাশ কারাত।
এদিন আলোচনাসভায় অংশ নেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী এবং সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো সদস্য পিনারাই বিজয়ন, তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এবং ডিএমকে নেতা এমকে স্ট্যালিন এবং কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী এমসি সুধাকর।
বক্তারা একযোগেই বলেন, রাজ্যগুলির অধিকারের পক্ষে লড়াই কেবল সে রাজ্যেগুলির সরকারের বিষয় নয়। সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের পক্ষে রয়েছে এমন সব অংশের লড়াই। কারাত আলোচনার সূত্রপাত করে বলেন,
পার্টি কংগ্রেসে জাতীয় রাজনীতি আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা মনে করেছি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত এবং রাজ্যের অধিকার রক্ষা প্রসঙ্গে আলোচনাসভা জরুরি। এই তিন রাজ্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে যে মোদী সরকার কিভাবে অন্তর্ঘাত করছে রাজ্যের অধিকারের প্রশ্নে। স্বাধীনতার পর, সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর এমন মারাত্মক আঘাত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতে কখনও করা হয়নি।
কারাত বলেন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের সব ক্ষেত্র- আর্থিক, কোষাগারীয় রাজনৈতিক- সব ক্ষেত্রে রাজ্যের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। অথচ সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা বলা রয়েছে। বলা রয়েছে যে ভারত যুক্তরাজ্য। সেই রাজ্যগুলির মর্যাদা নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নির্বাচিত সরকারকে আবেদন নিবেদন করতে হচ্ছে রাজ্যের মানুষের উন্নয়নে অর্থের জন্য।
কারাত বলেন, নির্বাচিত রাজ্য সরকারের ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে। রাজ্যপালদের ভূমিকা আমরা দেখেছি। তামিলনাডু, কেরালা, কর্ণাটকেও রাজ্যপালদের ভূমিকা আমরা দেখেছি। অ-বিজেপি রাজ্য হলেই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে রাজ্যগুলিকে। খরার ত্রাণের অর্থ পেতে সুপ্রিম কোর্টে যেতে হয় কর্ণাটককে। তামিলনাডুকে বন্যার ত্রাণের অর্থের জন্য লড়তে হচ্ছে। কেরালায় ওয়েনাড়ে ধসের পর সব প্রয়াস সত্ত্বেও কেরালা কেন্দ্রের থেকে পুনর্বাসন পুনর্গঠনের টাকা পায়নি।
কারাত বলেছেন, এই প্রথম স্বাধীন ভারতে একটি পূর্ণ রাজ্যকে ভেঙে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হলো। জম্মু ও কাশ্মীরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বেআইনিভাবে। তিনি বলেন, সংবিধানের লঙ্ঘন এবং রাজ্যের অধিকারের বিপদের পাশাপাশি বিপদ রয়েছে গণতন্ত্রেরও। কারণ সব রাজ্যের নির্বাচিত বিধানসভা আছে। বিধানসভায় গরিষ্ঠতা প্রমাণ করে রাজ্য সরকার পরিচালনা করতে হয়। ফলে রাজ্য সরকারের অধিকার খর্ব করা আসলে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষার লড়াই আসলে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই।
কারাত বলেন, একাধিক অ-বিজেপি সরকার একযোগে লড়াই শুরু করেছে। তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়েছেন আসন পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে।
২২ মার্চ বৈঠক হয়েছে চেন্নাইয়ে। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক দল যোগ দিয়েছে। জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি তৈরি হয়েছে। বৈঠকে ওডিশার, পাঞ্জাবের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও ছিলেন। কারাত বলেন, ২০২৬’র জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে সংসদে রাজ্যভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্যে গুরুতর অভাব হবে। রাজনৈতিক দমনের রাস্তা আরও চওড়া করবে এই পদক্ষেপ।
উল্লেখ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে যে রাজ্যগুলি, আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে সংসদে কমতে পারে তাদের প্রতিনিধিত্ব। দক্ষিণের একাধিক রাজ্যে, সেক্ষেত্রে, প্রতিনধি কমে যাবে লোকসভায়।
কারাত উল্লেখ করেন যে কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে বৈঠক হয় বিভিন্ন রাজ্যের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি গাইডলাইনের খসড়া সংক্রান্ত আলোচনা হয়। তা চালু হলে আরএসএস কার্যত ঠিক করবে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য কারা হবেন। তিরুবনন্তপুরমে শিক্ষা সংক্রান্ত এরকম বৈঠক হয়েছে। কারাত বলেন, কেবল সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারেরই নয়, গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সব শক্তির দায়িত্ব রয়েছে। সকলকে একসঙ্গে লড়তে হবে। ভারতের একতাকে মজবুত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্যই এই লড়াই জরুরি।
পিনারাই বিজয়ন বলেন, কেরালাকে উন্নয়নের জন্য ঋণ নিতেও বাধা দিচ্ছে কেন্দ্রের এই সরকার। আরেকদিকে কেরালাকে কেন্দ্রীয় কর এবং অনুদানের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ব্যাপক মাত্রায়। একতরফা ভাবে কেন্দ্র সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। যাতে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে, জনতার সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয় না বাড়াতে পারে কেরালা।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে, এমন বিল সংসদে পাশ হচ্ছে। রাজ্য বিধানসভায় পাশ বিল আটকে রাখা হচ্ছে রাজভবনে।
বিজয়ন বলেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, যাতে কোনও কোনও রাজ্যের ক্ষতি হচ্ছে, রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে না। শিক্ষার ক্ষেত্রে এই মনোভাব আরও প্রকট। আরএসএস’র দৃষ্টিভঙ্গিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শিক্ষানীতি নিচ্ছে কেন্দ্র। রাজ্যের ওপর সেটিই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন ইউজিসি’র খসড়া বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগেও রাজ্যের ভূমিকা থাকবে না। শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আঘাত নামানো হচ্ছে। এক দেশ, এক ভোট নীতি চালুর দিকে এগনো হচ্ছে। সেখানে বিধানসভার মেয়াদ কমিয়ে দেওয়ার সংস্থান রয়েছে। একসঙ্গে ভোট করানোর তৎপরতা একতরফা মনোভাবের প্রতিফলন।
তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন তামিলে ভাষণ দেন। আসন পুনর্বিন্যাস থেকে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার কেন্দ্রীয় তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার অঙ্গীকার জানান তিনি। যৌথ লড়াইয়ের আহ্বান জানান তিনি।
কর্ণাটকের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী সুধাকর বলেন, কর্ণাটকে গৃহলক্ষ্মীর মতো প্রকল্প, বা তামিলনাডু স্বাস্থ্য প্রকল্প করা হয়েছে পরিস্থিতি বুঝে। সব প্রকল্প দিল্লি থেকে ঠিক করে দেওয়া যায় না। সব রাজ্যকে এক করে দেখাও চলে না। রাজ্যের অধিকারকে উন্নয়নে বাধা হিসেবে দেখা বিপদের। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আসলে সব অংশের উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
Party Congress: Federalism Seminar
পার্টি কংগ্রেসে সেমিনার: রাজ্যের অধিকারের লড়াই প্রয়োজন গণতন্ত্র রক্ষার জন্যও

×
Comments :0